- ২৭ জুন, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
একসময় তাঁর নামই ছিল সাফল্যের প্রতিশব্দ। সিনেমা হলে তাঁর ছবি মুক্তি মানেই দর্শকের ভিড়, আর পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই আবেগঘন এক রোমান্টিক অভিজ্ঞতা। হিন্দি চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা ভারত ভূষণ একসময় ছিলেন লাখো দর্শকের হৃদয়ের নায়ক। অথচ জীবনের শেষ অধ্যায়ে সেই মানুষটিকেই নীরবে হারিয়ে যেতে হয়েছিল আলো-ঝলমলে বলিউডের অঙ্গন থেকে।
১৯৪১ সালে অভিনয়জীবন শুরু করলেও ভারত ভূষণের ভাগ্য বদলে যায় ১৯৫২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘বাইজু বাওরা’ ছবির মাধ্যমে। সংগীতনির্ভর এই চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। এরপর ‘আনন্দ মঠ’, ‘বরসাত কি রাত’ এবং ‘মির্জা গালিব’-এর মতো একের পর এক সফল ছবিতে অভিনয় করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন সেই সময়ের প্রথম সারির অভিনেতাদের কাতারে।
তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সংযত আবেগ প্রকাশ। প্রচলিত নায়কোচিত ভাবমূর্তির পরিবর্তে কোমল অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা এবং সংবেদনশীল অভিনয় তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছিল। এ কারণেই দর্শকদের কাছে তিনি ছিলেন ভদ্র, মার্জিত ও রোমান্টিক নায়কের প্রতীক।
সাফল্যের সময় মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় তাঁর মালিকানায় ছিল একাধিক বাংলো। এর মধ্যে ‘আশীর্বাদ’ নামের বাড়িটি বলিউডের অন্যতম পরিচিত ঠিকানায় পরিণত হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই বাড়ির মালিক হন অভিনেতা রাজেন্দ্র কুমার এবং পরে বলিউডের প্রথম সুপারস্টার রাজেশ খান্না। একসময় যে বাড়িতে চলচ্চিত্র অঙ্গনের তারকাদের আনাগোনা ছিল নিয়মিত, সময়ের ব্যবধানে সেটিও হাতছাড়া হয়ে যায় ভারত ভূষণের।
অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনায় নামাই তাঁর জীবনের বড় মোড় হয়ে দাঁড়ায়। নিজের অর্থ বিনিয়োগ করে একের পর এক ছবি নির্মাণ করলেও প্রত্যাশিত সাফল্য পাননি। কয়েকটি ছবির বাণিজ্যিক ব্যর্থতায় দ্রুত আর্থিক সংকটে পড়েন তিনি। বিশেষ করে একটি বড় বাজেটের চলচ্চিত্রের লোকসান তাঁর আর্থিক ভিত্তিকে ভেঙে দেয়। একসময় গাড়ি, বাংলো, জমিসহ প্রায় সব সম্পত্তিই বিক্রি করতে বাধ্য হন। বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে আশ্রয় নেন মুম্বাইয়ের মালাড এলাকার একটি সাধারণ ফ্ল্যাটে।
তবে কঠিন বাস্তবতাও তাঁকে অভিনয় থেকে দূরে সরাতে পারেনি। প্রধান চরিত্র থেকে সরে এসে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করেও তিনি নিজের পেশার প্রতি নিষ্ঠা বজায় রেখেছিলেন। তাঁর মেয়ে অপরাজিতা ভূষণ পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আর্থিক সংকট থাকলেও তাঁর বাবা কখনো আত্মসম্মানের সঙ্গে আপস করেননি এবং সহানুভূতি অর্জনের জন্য নিজের অবস্থাকে ব্যবহার করেননি।
ভারত ভূষণের শেষ জীবনের একটি ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন, একদিন তিনি রাস্তার পাশে একটি বাসস্ট্যান্ডে সাধারণ মানুষের ভিড়ে ভারত ভূষণকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন। একসময় কোটি মানুষের প্রিয় সেই তারকাকে কেউ চিনতে পারছিল না। অমিতাভ তাঁকে গাড়িতে তুলে নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু এতে প্রবীণ অভিনেতা অস্বস্তিতে পড়তে পারেন—এই আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যাননি। সেই দৃশ্য তাঁকে খ্যাতির ক্ষণস্থায়িত্ব সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করেছিল।
ভারত ভূষণের শেষকৃত্য নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। একসময় দাবি করা হয়েছিল, তাঁর শেষ বিদায়ে খুব অল্পসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। যদিও তাঁর মেয়ে পরে এ বিষয়ে প্রচলিত কিছু তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে এটুকু সত্য যে, জীবনের শেষ সময়টা তিনি অনেকটাই নীরবে কাটিয়েছেন।
১৯৯২ সালে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ভারত ভূষণ। তাঁর প্রয়াণে শেষ হয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। আজও তাঁর জীবনকাহিনি শুধু একজন অভিনেতার উত্থান-পতনের ইতিহাস নয়; বরং খ্যাতি, সাফল্য এবং সময়ের নির্মম বাস্তবতার এক অনন্য দলিল হিসেবে স্মরণ করা হয়।