Monday, January 19, 2026

সুরের ভেতর দিয়ে একটি যুগ গড়ে তোলা মানুষ: আলাউদ্দিন আলী


ফাইল ছবিঃ আলাউদ্দীন আলী (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

বাংলা গানের দীর্ঘ ইতিহাসে বহু সুরকার এসেছেন, জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, সময়ের চাহিদা পূরণ করেছেন। তবে হাতে গোনা কয়েকজনই আছেন, যাঁরা কেবল সফল নন—বরং সংগীতের ভাষাই বদলে দিয়েছেন। আলাউদ্দিন আলী ছিলেন তেমনই একজন শিল্পী, যাঁর সুরে গড়ে উঠেছে বাংলা চলচ্চিত্রগানের নিজস্ব একটি মানদণ্ড।

১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে জন্ম তাঁর। সংগীত ছিল আলাউদ্দিন আলীর পারিবারিক উত্তরাধিকার। বাবা ওস্তাদ জাদব আলী এবং মা জোহরা খাতুন দুজনই সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আত্মীয়স্বজনের বড় অংশই ছিলেন সংগীত পরিবারভুক্ত। ফলে ছোটবেলা থেকেই সুর, তাল ও লয়ের ভেতরেই বেড়ে ওঠেন তিনি। পরিবারের গুণীজনদের কাছেই উচ্চাঙ্গসংগীতে তালিম নেন এবং নিজের মেধা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সেই শিক্ষা গভীরভাবে আত্মস্থ করেন।

আলাউদ্দিন আলীর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল—তিনি চলচ্চিত্রের গানকে কখনোই গৌণ শিল্প হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে গান ছিল স্বতন্ত্র এক শিল্পমাধ্যম। সিনেমার প্রয়োজনে তৈরি হলেও তাঁর সুর করা গান পর্দার সীমা ছাড়িয়ে শ্রোতার মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। এই কারণেই তাঁর গানগুলো আজও আলাদা করে মূল্যায়িত হয়।

বাংলা চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক সময়েও তিনি সুরে এনেছিলেন সংযম ও গভীরতা। উচ্চাঙ্গসংগীত ও লোকজ উপাদানকে আধুনিক সংগীতচিন্তার সঙ্গে মিলিয়ে তিনি তৈরি করেন এক স্বকীয় ঘরানা, যা শুনলেই চেনা যায়। দেশপ্রেমের গানে তিনি এনে দেন আবেগের ভিন্ন মাত্রা। ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ বা ‘সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি’—এই গানগুলো কেবল দেশাত্মবোধক নয়, বরং মানুষের স্মৃতি, শিকড় ও আত্মপরিচয়ের অনুভূতিকে স্পর্শ করে।

বেদনার গানেও তাঁর সুর ছিল নীরব অথচ গভীর। ‘আমায় গেঁথে দাও না মাগো একটা পলাশ ফুলের মালা’—এমন গানগুলো কান্নার চেয়ে বেশি অনুভূতির ভার তৈরি করে। প্রেমের গানেও তিনি ছিলেন সংযত ও ব্যক্তিগত। তাঁর সুরে প্রেম কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়, বরং অন্তর্গত অনুভবের প্রকাশ।

নতুন শিল্পী তৈরিতেও আলাউদ্দিন আলীর অবদান অনস্বীকার্য। প্রতিষ্ঠিত কণ্ঠের পাশাপাশি তিনি বিশ্বাস রেখেছেন নতুনদের ওপর। কনকচাঁপা, কুমার বিশ্বজিৎ, সামিনা চৌধুরী, তপন চৌধুরী, আইয়ুব বাচ্চু, হাসানসহ বহু শিল্পীর চলচ্চিত্রগানের যাত্রা শুরু হয়েছে তাঁর সুরে।

প্রায় পাঁচ হাজারের কাছাকাছি গান তিনি সুর করেছেন—চলচ্চিত্র, বেতার ও টেলিভিশনের জন্য। তবে সংখ্যার চেয়েও বড় তাঁর গানের স্থায়িত্ব। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আজও তাঁর সুরে আবেগ খুঁজে পায়।

১৯৭৪ সালে চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু হলেও প্রকৃত সাফল্য আসে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবির মাধ্যমে। ‘আছেন আমার মোক্তার’ গানটি তাঁকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় গানে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রগানের অপরিহার্য নাম।

ব্যক্তিজীবনে আলাউদ্দিন আলী ছিলেন প্রচারবিমুখ। সুরই ছিল তাঁর ভাষা, সৃষ্টিই ছিল তাঁর পরিচয়। দীর্ঘদিন অসুস্থতার পর ২০২০ সালে তিনি চলে গেলেও তাঁর সুর রয়ে গেছে মানুষের অনুভূতিতে।

আজ তাঁর জন্মদিনে শুধু স্মরণ নয়, শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করতেই হয়—আলাউদ্দিন আলী বাংলা গানের ইতিহাসে কেবল একটি অধ্যায় নন, তিনি একটি ভিত্তি। তাঁর সুরে গড়া সেই মানদণ্ড আজও অটুট, সময় পেরিয়েও যা নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগায়।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন