Thursday, March 5, 2026

রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের প্রশংসিত স্টার্টআপ ইন্সেক্ট বন্ধের পথে


ছবিঃ (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

এক সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনায় উঠে এসেছিল ফ্রান্সের কীটভিত্তিক প্রোটিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান Ÿnsect। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে হলিউড অভিনেতা রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের প্রশংসার পর প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে। তবে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই প্রতিষ্ঠানকেই দেউলিয়া ঘোষণার পথে যেতে হলো। আর্থিক অক্ষমতার কারণে আদালতের নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এই পরিণতি হঠাৎ করে আসেনি। দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক সংকটে ভুগছিল Ÿnsect। তবুও বিস্ময়ের বিষয় হলো ছয়শ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ সংগ্রহের পরও কেন প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাকতে পারল না। এই বিপুল অর্থের একটি অংশ এসেছিল রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ উদ্যোগ, ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা এবং বিভিন্ন সামাজিক দায়বদ্ধ বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে।

Ÿnsect-এর মূল লক্ষ্য ছিল পোকামাকড় থেকে প্রোটিন উৎপাদন করে প্রচলিত খাদ্য ও পশুখাদ্যের বিকল্প তৈরি করা। তবে প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতার পেছনে শুধু পোকামাকড়ভিত্তিক খাদ্যের প্রতি মানুষের অনীহা দায়ী নয়। কারণ শুরু থেকেই মানুষের খাবার তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল না। তারা মূলত পশুখাদ্য ও পোষা প্রাণীর খাদ্য বাজারে কাজ করছিল যে দুটি খাতের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও লাভের ধরন একেবারেই ভিন্ন।

এই দ্বিধা আরও স্পষ্ট হয় ২০২১ সালে, যখন প্রতিষ্ঠানটি নেদারল্যান্ডসের একটি মানবখাদ্যভিত্তিক কীটচাষকারী প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে। সে সময় Ÿnsect-এর তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্বীকার করেছিলেন যে, মানুষের খাদ্য খাত থেকে উল্লেখযোগ্য আয় আসতে বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে। অর্থাৎ, যে খাতটি দীর্ঘ সময় ধরে গৌণই থাকবে, সেখানেই বড় বিনিয়োগ করা হয় যখন প্রতিষ্ঠানটির জরুরি প্রয়োজন ছিল দ্রুত আয় বৃদ্ধি।

আয়ের অভাবই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ আয় ছিল প্রায় এক কোটি আটাত্তর লাখ ইউরো। পরবর্তী সময়ে এই আয় কমতে থাকে এবং ২০২৩ সালে গিয়ে তাদের লোকসান দাঁড়ায় প্রায় আট কোটি ইউরোতে।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায় এত অল্প আয় থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এত বড় অঙ্কের বিনিয়োগ পাওয়া সম্ভব হলো? এর পেছনে ছিল পরিবেশবান্ধব ও টেকসই প্রোটিনের বিকল্প দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। মাছের খাদ্য ও সয়াবিনভিত্তিক প্রোটিনের পরিবর্তে কীটভিত্তিক প্রোটিন ব্যবহারের ধারণা অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন। পশুখাদ্যের বাজার মূলত দামের ওপর নির্ভরশীল। এখানে পরিবেশবান্ধব হওয়ার চেয়ে কম খরচে উৎপাদনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাত্ত্বিকভাবে পোকামাকড় খাদ্যবর্জ্য খেয়ে প্রোটিন তৈরি করতে পারে, কিন্তু বাস্তবে বড় পরিসরে উৎপাদনের জন্য তাদের খাওয়াতে হয় শস্যজাত উপপণ্য, যা সরাসরি পশুখাদ্য হিসেবেই ব্যবহার করা যায়। ফলে কীটভিত্তিক প্রোটিন আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে Ÿnsect বুঝতে পারে যে পোষা প্রাণীর খাদ্যের বাজার তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক। ২০২৩ সালে তারা এই খাতে মনোযোগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। এর আগেই তারা উত্তর ফ্রান্সে গড়ে তোলে একটি বিশাল উৎপাদন কেন্দ্র, যা বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল কীটচাষ প্রকল্পগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল। শত শত মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে নির্মিত এই স্থাপনা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভারসাম্য ভেঙে দেয়।

পরবর্তীতে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন, কারখানা বন্ধ এবং কর্মী ছাঁটাই করেও প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচানো যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, Ÿnsect-এর পতনের মূল কারণ ছিল অতিরিক্ত শিল্পগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বাজার বাস্তবতা সম্পর্কে ভুল ধারণা এবং সময়ের আগেই বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত।

তবে এর অর্থ এই নয় যে কীটভিত্তিক প্রোটিন খাত সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ। একই খাতে কাজ করা অন্য কিছু প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক ছোট পরিসরে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করায় এখনো টিকে আছে।

Ÿnsect-এর এই পরিণতি ইউরোপের শিল্পভিত্তিক নতুন উদ্যোগগুলোর একটি বড় দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে উদ্ভাবনী ধারণায় অর্থায়ন থাকলেও, বাস্তব উৎপাদন ও দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সহায়তার ঘাটতি।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন