- ০৯ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
পরিষ্কার জ্বালানি, পারমাণবিক শক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদকে ঘিরে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে নতুন সমঝোতায় পৌঁছেছে অস্ট্রেলিয়া ও ভারত। বৃহস্পতিবার স্বাক্ষরিত এক চুক্তির আওতায় অস্ট্রেলিয়া প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে ভারতে ইউরেনিয়াম রপ্তানির পথ উন্মুক্ত করল। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রিন হাইড্রোজেন এবং ক্রিটিক্যাল মিনারেলস খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও একমত হয়েছে দুই দেশ।
মেলবোর্নে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক শেষে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক শুধু কৌশলগত নয়, পারস্পরিক আস্থার ওপরও দাঁড়িয়ে আছে। তার ভাষায়, এই সমঝোতা ভারতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার খনিজ সম্পদ রপ্তানির জন্যও নতুন বাজার তৈরি করবে।
ভারত আগামী ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরেই অস্ট্রেলিয়ার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের প্রতি আগ্রহ দেখিয়ে আসছে নয়াদিল্লি। অন্যদিকে চীনের ওপর বাণিজ্যিক নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প বাজার গড়ে তুলতে চায় ক্যানবেরা। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই চুক্তি দুই দেশের সেই কৌশলগত স্বার্থকেই আরও এগিয়ে নেবে।
যদিও অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মধ্যে ২০১৪ সালে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি হয়েছিল, তারপরও ইউরেনিয়াম রপ্তানি সীমিত ছিল। কারণ, এই জ্বালানি সামরিক কর্মসূচিতে ব্যবহারের আশঙ্কা নিয়ে দীর্ঘদিন উদ্বেগ ছিল। নতুন সমঝোতায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়া থেকে সরবরাহ করা ইউরেনিয়াম কেবল শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হবে।
নরেন্দ্র মোদি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ভারতের জ্বালানি রূপান্তরকে আরও গতিশীল করতে পারে। তিনি বিশেষ করে কম-কার্বন অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে দুই দেশের যৌথ কাজের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে মোদি ভারতের সড়ক, বন্দর, রেলপথ ও নগর উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, স্থিতিশীল ও টেকসই বিনিয়োগের জন্য ভারত একটি নির্ভরযোগ্য গন্তব্য।
একই দিনে অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম পেনশন তহবিল ‘অস্ট্রেলিয়ানসুপার’ ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ডে আরও ৫০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। এটিকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠকের পর আলবানিজ নরেন্দ্র মোদিকে দুই দেশের মধ্যে একটি ‘জীবন্ত সেতুবন্ধন’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মোদির নেতৃত্বে ভারত-অস্ট্রেলিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে ভারত অস্ট্রেলিয়ার পঞ্চম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। এছাড়া প্রায় ১০ লাখ ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করেন, যা দুই দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।
এদিকে মোদির সফরকে ঘিরে মেলবোর্নে প্রবাসী ভারতীয়দের ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেলেও একটি ক্ষুদ্র উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠী অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ করে। তবে ভারতীয় পতাকা হাতে জড়ো হওয়া হাজারো সমর্থকের উপস্থিতিতে সেই বিক্ষোভ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।
ইন্দোনেশিয়া সফর শেষে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছান নরেন্দ্র মোদি। সফরের পরবর্তী গন্তব্য নিউজিল্যান্ড, এরপর তিনি ভারতে ফিরে যাবেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় ভারত-অস্ট্রেলিয়ার এই নতুন সমঝোতা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।