- ০৯ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
পারস্য উপসাগরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক উত্তেজনা আবারও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর কিছুক্ষণ পরই বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ফলে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে চলমান অন্তর্বর্তী সমঝোতা কার্যত আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে সাম্প্রতিক হামলার মাধ্যমে ইরান যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেই ঘটনার জবাব হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একাধিক সামরিক ঘাঁটি, বন্দরসংলগ্ন অবকাঠামো ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।
হামলার পর বাহরাইনে অন্তত দুই দফা সতর্কতা সাইরেন বেজে ওঠে। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত। একই সময়ে কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা আকাশসীমায় প্রবেশ করা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার অভিযান চালিয়েছে। কাতারেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। তবে তিন দেশেই তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, নতুন এই অভিযান হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতা আরও দুর্বল করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছে। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম জানিয়েছে, বুশেহরসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বুশেহরে ইরানের অন্যতম প্রধান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া চাবাহার, কোনারাক, বন্দর আব্বাস ও সিরিক এলাকায়ও হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইরানশাহর বিমানবন্দরে হামলায় এক দমকলকর্মীর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
এবারের অভিযানে ইরানের পরিবহন অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানা গেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় গোলেস্তান প্রদেশের একটি রেলসেতুতে হামলা হয়েছে। আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, মাশহাদের পথে দুটি সেতু লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। সেখানেই বৃহস্পতিবার দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনের প্রস্তুতি চলছে।
ন্যাটো সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কঠোর বার্তা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন হামলা আবার হলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। একই সঙ্গে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্রকল্প এবং খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার আগের হুমকিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও শক্তি প্রদর্শনের মূল্য এবার যুক্তরাষ্ট্রকেও দিতে হবে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদিও ট্রাম্পের বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ককেই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও নতুন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রেখে স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর আলোচনা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না হলেও সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলায় সেই প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।