Wednesday, October 28, 2026

অ্যানথ্রপিকের আইপিওতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে অ্যামাজন-গুগল


প্রতীকী ছবিঃ অ্যানথ্রপিক (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে বড় অঙ্কের মুনাফার মুখ দেখতে পারেন এর বিনিয়োগকারীরা। তবে লাভের দৌড়ে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যামাজন ও গুগল এগিয়ে থাকতে পারে। অ্যানথ্রপিকে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবসার সম্পর্কও।

প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেনলো ভেঞ্চারস, সিকোয়া ক্যাপিটাল, সাউন্ড ভেঞ্চারস ও স্পার্ক ক্যাপিটালের মতো বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য আইপিও থেকে বিপুল মুনাফা পেতে পারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য জমা দেওয়া এস-১ নথি অনুযায়ী, এসব ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানের কোনো এককটির মালিকানায় অ্যানথ্রপিকের ৫ শতাংশ শেয়ার নেই।

প্রযুক্তি খাতের প্রচলিত আইপিওতে প্রধান বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে প্রায়ই দুই অঙ্কের শতাংশ শেয়ার থাকে। অ্যানথ্রপিকের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। কারণ, প্রতিষ্ঠানটির বেসরকারি বাজারমূল্য প্রায় ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বা ৯৬৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই মূল্যায়নে মাত্র ১ শতাংশ শেয়ারের মূল্যই প্রায় ৯৬৫ কোটি ডলার। ফলে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ থাকলেও মোট মালিকানার শতাংশের হিসাবে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ তুলনামূলক ছোট দেখাচ্ছে।

ব্লুমবার্গের তথ্যের ভিত্তিতে টেকক্রাঞ্চ জানিয়েছে, মেনলো ভেঞ্চারসের অ্যানথ্রপিকে থাকা বিনিয়োগের মূল্য প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। তবে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মূল্যায়নে তা কোম্পানিটির আনুমানিক ১ দশমিক ৫ শতাংশের সমান।

অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য আইপিও থেকে সবচেয়ে বেশি আর্থিক সুবিধা পেতে পারে অ্যামাজন। ২০২৩ সালে এআই প্রতিষ্ঠানটিতে সর্বোচ্চ ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাত্রা শুরু করে অ্যামাজন। এরপর কয়েক দফায় আরও অর্থ বিনিয়োগ করেছে ই-কমার্স ও ক্লাউড সেবার এই জায়ান্ট।

অ্যানথ্রপিকে বিনিয়োগের একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে অ্যামাজন সরাসরি শেয়ার কেনার পরিবর্তে কনভার্টিবল নোট ব্যবহার করেছে। এটি একধরনের ঋণ, যা নির্দিষ্ট শর্তে আইপিও বা কোম্পানি বিক্রির মতো ঘটনার সময় শেয়ারে রূপান্তরিত হতে পারে।

অ্যানথ্রপিকের এস-১ নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অ্যামাজনের হাতে থাকা কনভার্টিবল নোটের মূল ঋণমূল্য ছিল ৬২০ কোটি ডলার। ওই সময় অ্যানথ্রপিকের মোট ঋণের পরিমাণও ছিল এই অর্থ। অন্যদিকে, অ্যামাজনের নিজস্ব আর্থিক নথিতে এসব নোটের মূল্য দেখানো হয়েছে ৯ হাজার ৭৯০ কোটি ডলার।

অ্যানথ্রপিকের মূল্যায়ন একের পর এক বিনিয়োগ পর্বে বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে এসব নোট থেকে পাওয়া শেয়ারের সম্ভাব্য মূল্যও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে অ্যানথ্রপিকের আর্থিক হিসাবেও। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে কনভার্টিবল নোট, ডেরিভেটিভ দায় ও সেফসের ন্যায্য মূল্য পরিবর্তনের খাতে ৭২৪০ কোটি ডলারের হিসাব সমন্বয় দেখিয়েছে। এটি নগদ অর্থ পরিশোধ নয়; বরং আর্থিক হিসাবের মূল্যায়নজনিত পরিবর্তন।

এস-১ নথি অনুযায়ী, অ্যামাজনের নোটগুলো থেকে সর্বোচ্চ ১৮৪ কোটি শেয়ার পাওয়া যেতে পারে। তবে অ্যানথ্রপিকের আংশিকভাবে পাতলাকৃত শেয়ারসংখ্যার সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ পর্যন্ত মালিকানার সীমা রয়েছে। এই হিসাবে এখনো ইস্যু না হওয়া কিছু শেয়ার, যেমন স্টক অপশনও অন্তর্ভুক্ত হয়। অ্যামাজন চাইলে এ সীমা মওকুফ করতে পারে। সীমার কারণে যে নোটগুলো তাৎক্ষণিকভাবে শেয়ারে রূপান্তরিত হতে পারবে না, সেগুলো বকেয়া থাকবে এবং পরবর্তী সময়ে একই শর্ত সাপেক্ষে রূপান্তরের সুযোগ পাবে।

কনভার্টিবল নোটের বাইরেও অ্যানথ্রপিকে অ্যামাজনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। অ্যামাজনের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটি অ্যানথ্রপিকের ভোটাধিকারহীন প্রেফার্ড শেয়ারে আরও ১০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে সর্বশেষ দুটি বিনিয়োগ পর্বে প্রতিবার ৫০০ কোটি ডলার করে দেওয়া হয়। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নোটের মাধ্যমে বিনিয়োগ করা ৮০০ কোটি ডলারসহ অ্যানথ্রপিকে অ্যামাজনের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮০০ কোটি ডলার।

অ্যানথ্রপিকের শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি থেকে সম্ভাব্য লাভের পাশাপাশি অ্যামাজনের ক্লাউড সেবা অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। অ্যানথ্রপিক আগামী ১০ বছরে এডব্লিউএসের ক্লাউড সেবা ব্যবহারে অন্তত ১১ হাজার কোটি ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

অর্থাৎ, অ্যানথ্রপিকের বাজারমূল্য বাড়লে অ্যামাজন বিনিয়োগের মূল্যবৃদ্ধি থেকে সুবিধা পেতে পারে। পাশাপাশি অ্যানথ্রপিকের এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনায় প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং অবকাঠামো সরবরাহ করেও আয় করতে পারবে প্রতিষ্ঠানটি।

অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য আইপিও থেকে লাভবান হওয়ার অবস্থানে রয়েছে গুগলও। আদালতে দাখিল করা নথির বরাতে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে অ্যানথ্রপিকে গুগলের মালিকানা ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ। এরপরও প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে বিনিয়োগ করেছে। গত এপ্রিলে গুগল অ্যানথ্রপিকে আরও ১০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে।

পরবর্তী সময়ে অ্যানথ্রপিকের বিশাল অঙ্কের নতুন বিনিয়োগ সংগ্রহের ফলে গুগলের মালিকানার শতাংশ কমে আসতে পারে। টেকক্রাঞ্চকে পিচবুকের বিশ্লেষক হ্যারিসন রলফস জানিয়েছেন, তাঁর হিসাবে বর্তমানে অ্যানথ্রপিকে গুগলের অংশীদারত্ব প্রায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে।

অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে গুগলের ক্লাউড ব্যবসার সম্পর্কও উল্লেখযোগ্য। ২০৩৩ সাল পর্যন্ত গুগলের ক্লাউড সেবা ব্যবহারে অন্তত ১১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে অ্যানথ্রপিকের।

অ্যানথ্রপিকের আইপিও ঘিরে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য মুনাফা নিয়ে আলোচনা থাকলেও বিনিয়োগের পাশাপাশি ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে অ্যামাজন ও গুগলের অবস্থান আলাদা। প্রতিষ্ঠান দুটি অ্যানথ্রপিকের শেয়ারধারী হওয়ার পাশাপাশি তাদের ক্লাউড অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী।

তবে এ সম্পর্কের মধ্যে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতও রয়েছে। অ্যানথ্রপিকের এস-১ নথিতে সতর্ক করা হয়েছে, ক্লাউড সেবা সরবরাহকারী কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেরাও প্রতিদ্বন্দ্বী এআই মডেল তৈরি করছে। ফলে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ সব সময় অ্যানথ্রপিকের স্বার্থের সঙ্গে মিলবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য আইপিও তাই শুধু প্রাথমিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা অর্জনের ঘটনা নয়; এটি এআই শিল্পে বিনিয়োগ, কম্পিউটিং অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর পারস্পরিক নির্ভরতার চিত্রও তুলে ধরছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন