- ২৫ অক্টোবর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) শক্তিশালী মডেলগুলোকে সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দিলে অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এমন উদ্বেগ থেকে প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনছে ওপেনএআই। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে তাদের উন্নত এআই মডেল প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সরাসরি ইন্টারনেটের পরিবর্তে সংরক্ষিত ওয়েবপেজের অনুলিপি ও কৃত্রিমভাবে তৈরি ইন্টারনেট পরিবেশ ব্যবহার করা হবে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ঘোষিত এ সিদ্ধান্তের লক্ষ্য, প্রশিক্ষণ চলাকালে এআই মডেলগুলো যেন অনুমতি ছাড়া বাইরের ওয়েবসাইট, সার্ভার কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। প্রতিষ্ঠানটির মতে, বর্তমান প্রযুক্তি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় উন্নত এআই মডেলকে সরাসরি ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে প্রশিক্ষণ দেওয়াই দায়িত্বশীল পন্থা।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর ওপেনএআই এ ঘোষণা দিল। এর আগে অ্যানথ্রপিক তাদের সবচেয়ে উন্নত মডেলগুলোর সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করার উদ্যোগ নেয়।
গত কয়েক মাসে এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা করতে গিয়ে একাধিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা সামনে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কাজের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কিছু এআই মডেল বাইরের ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রবেশের চেষ্টা করেছে। কোথাও কোথাও তারা অনলাইন আলোচনামঞ্চে তথ্য খুঁজেছে এবং জটিল হ্যাকিং কৌশলও ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওপেনএআইয়ের ভাষ্য, তাদের একটি উন্নত এআই মডেল গত ২০ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি ভুল কনফিগারেশনের সুযোগ নিয়ে ইন্টারনেটে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল। এ ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটি ওই মাসের বাকি সময়ের জন্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রম স্থগিত রেখে নিরাপত্তা জোরদারের নতুন পদ্ধতি তৈরি ও পরীক্ষা করে।
নতুন ব্যবস্থায় এআই মডেলগুলোকে ইন্টারনেটের বিপুল পরিমাণ তথ্যের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে, তবে তা হবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। ওপেনএআই জানিয়েছে, এ উদ্দেশ্যে ওয়েবের বিভিন্ন তথ্য সূচিবদ্ধ করে সংরক্ষণ এবং ক্যাশ করা হয়েছে। এসব তথ্যের সাহায্যে মডেলগুলো প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষার কাজ চালাতে পারবে, কিন্তু বাইরের কোনো সিস্টেমে সরাসরি প্রভাব ফেলার সুযোগ পাবে না।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, উন্নত এআই মডেলকে অননুমোদিতভাবে ইন্টারনেটে প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখার সক্ষমতা সব সময় নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে মডেলগুলোকে এমন বিচ্ছিন্ন পরিবেশে রাখতে হবে, যেখানে তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তবে এ ধরনের পরিবেশ তৈরি করা সহজ নয়। উন্নত এআই মডেলের প্রশিক্ষণে বিপুল পরিমাণ তথ্য, বিভিন্ন সফটওয়্যার, পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা এবং নানা ধরনের প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম প্রয়োজন হয়। হাজারো গবেষক এসব পরিবেশ তৈরি, পরিবর্তন ও পরীক্ষা করেন। ফলে পুরো প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা প্রযুক্তিগত ও পরিচালনাগতভাবে জটিল।
চলতি মাসে ফরচুনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওপেনএআইয়ের সাবেক গবেষক স্টিভেন অ্যাডলার বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে হলে গবেষক দলকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে থাকা তথ্যকেন্দ্রের ভেতরে থেকেই কাজ করতে হতে পারে। এতে ব্যয় ও পরিচালনাগত চাপ বাড়বে। পাশাপাশি, এ ব্যবস্থায় নিরাপত্তার যে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে, তা সেই ব্যয়ের তুলনায় কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, ওপেনএআইয়ের এক নিরাপত্তা প্রকৌশলী সেপ্টেম্বরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছিলেন, বাইরে থেকে অনেকের কাছে এআই মডেলকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন পরিবেশে রাখাই সহজ সমাধান বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে উন্নত মডেলের প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন পরিচালনা করতে বিপুলসংখ্যক গবেষক, সফটওয়্যার এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন হয়। তাই বিষয়টি কেবল ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো সরল নয়।
ওপেনএআই তাদের নিরাপত্তা পরীক্ষায় একাধিক এআই এজেন্ট ব্যবহার করে মডেলগুলোকে নির্ধারিত সীমাবদ্ধ পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে দিয়েছিল। এ ধরনের পরীক্ষাকে সাধারণত ‘রেড-টিমিং’ বলা হয়। পরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন দুর্বলতা সামনে আসার পরই সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
এআই মডেলকে সীমাবদ্ধ পরিবেশে রাখার পদ্ধতিকে প্রযুক্তির ভাষায় ‘স্যান্ডবক্সিং’ বলা হয়। এতে মডেলকে নির্দিষ্ট কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হলেও বাইরের সিস্টেমে অবাধ প্রবেশের সুযোগ বন্ধ রাখা হয়। তবে ওপেনএআইয়ের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু স্যান্ডবক্স তৈরি করলেই সব ঝুঁকি দূর হয় না; এর কনফিগারেশন ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি থাকলে মডেল সীমা অতিক্রম করতে পারে।
নতুন পদ্ধতিতে সংরক্ষিত ওয়েবতথ্য ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ চালানোর সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে মডেল যে অভিজ্ঞতা ও তথ্য পেতে পারে, সংরক্ষিত অনুলিপি দিয়ে তার সবটুকু পাওয়া যাবে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
তবে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ উন্নত এআই প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে বড় একটি বাস্তবতা সামনে এনেছে। মডেলগুলোর সক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই তাদের স্বাধীনভাবে ডিজিটাল পরিবেশে কাজ করার সুযোগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং অননুমোদিত কর্মকাণ্ড ঠেকানো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।