- ১৭ জুন, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ঘিরে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশটির নেতৃত্ব এই সমঝোতাকে কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও বিরোধী মত ও অভ্যন্তরীণ সমালোচনার কারণে বিষয়টি সহজ হয়ে উঠছে না।
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাবের মধ্যে দাঁড়িয়ে তেহরান এখন জনমনে এই বার্তা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে যে, আলোচনার টেবিলে পৌঁছানো কোনো আত্মসমর্পণ নয়; বরং প্রতিরোধের ফল।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সমঝোতার অগ্রগতিকে “চূড়ান্ত বিজয়ের পথে বড় পদক্ষেপ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, চুক্তিটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
সরকারি মহলের যুক্তি হলো, সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো বহাল রয়েছে, পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কও বজায় আছে। তাই আলোচনায় অংশগ্রহণকে তারা নিজেদের কৌশলগত সাফল্যের অংশ হিসেবে দেখছে।
তবে দেশের ভেতরে এই ব্যাখ্যার সঙ্গে সবাই একমত নন। কট্টরপন্থী রাজনৈতিক মহলের একাংশ সমঝোতাকে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস হিসেবে দেখছে। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সমঝোতা ভবিষ্যতে ইরানের স্বাধীন নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদিও প্রকাশ্য বিরোধিতা আগের তুলনায় কমে এসেছে, তবুও ক্ষমতাকেন্দ্রের ভেতরে মতপার্থক্য পুরোপুরি দূর হয়নি। অনেকেই মনে করছেন, দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক চাপই সরকারকে আলোচনার পথে এগোতে বাধ্য করেছে।
ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সীমাবদ্ধতার চাপে রয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে তাই রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রার ব্যয় কমবে কি না এবং নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি হ্রাস পাবে কি না।
সম্ভাব্য সমঝোতার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা, আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কাঠামো এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আরও আলোচনা বাকি রয়েছে।
এদিকে ইসরায়েলের অবস্থানও অনিশ্চয়তার একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। লেবানন ইস্যু এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে মতপার্থক্যের খবর প্রকাশ্যে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরান সরকার আপাতত এই সমঝোতাকে রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। তবে সাধারণ জনগণের দৃষ্টিতে এর প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে অর্থনৈতিক স্বস্তি, নিষেধাজ্ঞা শিথিলতা এবং ভবিষ্যতে নতুন কোনো সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয় কি না—তার ওপর।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, সমঝোতার ভবিষ্যৎ সফলতা রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, বরং বাস্তব জীবনে এর প্রভাব কতটা দৃশ্যমান হয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে।