- ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি–এর নেতৃত্বে ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার হওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশটির অভ্যন্তরীণ নীতিতে ‘ইসরায়েলি মডেল’ অনুসরণের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, বিশেষ করে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর ইস্যুতে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ইসরায়েলের দৃষ্টান্ত ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।
২০১৯ সালে নিউইয়র্কে এক ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে ভারতের তৎকালীন কনসাল জেনারেল সন্দীপ চক্রবর্তী কাশ্মীরে “ইসরায়েলি মডেল” অনুসরণের কথা বলেছিলেন—এমন একটি ভিডিও প্রকাশ্যে আসে। ওই সময়েই কেন্দ্র সরকার সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে। এরপর অঞ্চলজুড়ে কড়া নিরাপত্তা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তারের ঘটনা আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়ে।
ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয়তাবাদী আদর্শ ‘হিন্দুত্ব’–এর কথা বলে আসছে। সমালোচকদের মতে, এই আদর্শের সঙ্গে ইসরায়েলের রাষ্ট্রচিন্তার মিল খুঁজে পান অনেকেই। লেখক আজাদ এসা তাঁর বই Hostile Homelands: The New Alliance Between India and Israel–এ দুই দেশের সম্পর্ককে “আদর্শিক ঘনিষ্ঠতা” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
গত এক দশকে বিজেপি-শাসিত কয়েকটি রাজ্যে দাঙ্গা বা উত্তেজনার ঘটনার পর মুসলিম মালিকানাধীন বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙার ঘটনা ঘটেছে, যা জনপ্রিয়ভাবে “বুলডোজার ন্যায়বিচার” নামে পরিচিত। সমালোচকদের দাবি, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই এসব উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এ কারণে সমর্থকদের কাছে ‘বুলডোজার বাবা’ উপাধি পেয়েছেন।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ ইসরায়েলের অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ধ্বংসের নীতির সঙ্গে তুলনীয়। যদিও ভারত সরকার বলছে, এসব ব্যবস্থা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই নেওয়া হয়।
ভারত বর্তমানে ইসরায়েলি অস্ত্রের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা। দুই দেশের মধ্যে ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নজরদারি প্রযুক্তি নিয়ে বিস্তৃত সহযোগিতা রয়েছে। বিতর্কিত স্পাইওয়্যার Pegasus–এর ব্যবহার নিয়েও ভারতে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। একাধিক সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী তাঁদের ফোনে নজরদারির অভিযোগ তুলেছেন। সরকার সরাসরি কোনো স্বীকারোক্তি না দিলেও বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর এখন বিশ্বের অন্যতম সামরিকায়িত অঞ্চল। ২০১৯ সালের পর থেকে সেখানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ, ইন্টারনেট বন্ধ এবং কঠোর আইন প্রয়োগের নজির দেখা গেছে। সমালোচকদের ভাষায়, এই পরিস্থিতি ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম তীরের সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে সাদৃশ্যপূর্ণ—যেখানে সামরিক উপস্থিতি ও বিশেষ আইনি কাঠামো দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে।
তবে ভারত সরকার বরাবরই বলে আসছে, কাশ্মীর দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সেখানে উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা জোরদার করাই তাদের লক্ষ্য।
মোদি তাঁর দ্বিতীয় ইসরায়েল সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। দুই দেশের সম্পর্ক বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষায় আরও গভীর হবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নীতিতে ইসরায়েলি প্রভাবের প্রশ্নে বিতর্কও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, এই সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নয়; বরং নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রপরিচালনার দর্শনেও দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকারপক্ষ বলছে, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব মানেই কোনো দেশের নীতির অনুকরণ নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতা।