- ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
দুই দশকের বেশি সময়ের সামরিক উপস্থিতির পর ইরাক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ পর্যায়ের সেনারা। বুধবারের নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী ইরাকে থাকা কয়েকশ মার্কিন সেনা দেশটি ছেড়েছেন। তারা মূলত ইসলামিক স্টেট (আইএস)বিরোধী আন্তর্জাতিক জোটের পরামর্শক ও সহায়ক ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে স্মরণীয় করে রাখতে ইরাকে চার দিন ‘সার্বভৌমত্ব দিবস’ পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে যে দীর্ঘ বিদেশি সামরিক উপস্থিতির সূচনা হয়েছিল, এই প্রত্যাহারের মাধ্যমে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদির সরকারের জন্য ঘটনাটি শুধু বিদেশি সেনা প্রত্যাহার নয়; বরং দেশের নিরাপত্তা ও সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব আরও জোরদারের একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সরকার আগামী জুন ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা করছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আল-জায়েদি বলেছিলেন, শান্তি ও যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের হাতেই থাকা উচিত। আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশন শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে সামরিক সহযোগিতার পরিবর্তে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার দিকে নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
তবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের সামনে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরানে ঘনিষ্ঠ কয়েকটি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী এখনো অস্ত্র সমর্পণে অনাগ্রহী। এসব গোষ্ঠীর কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে নিজেদের সশস্ত্র অবস্থানের অন্যতম যুক্তি হিসেবে তুলে ধরে এসেছে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডগলাস সিলিম্যানের মতে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের সরকার এসব গোষ্ঠীর হাতে অস্ত্র রাখার রাজনৈতিক যুক্তি দুর্বল করার চেষ্টা করতে পারে। তবে একই সঙ্গে এর ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত উত্তেজনা বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রেজলভ’-এর সমাপ্তির পর দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ২০১৭ সালে আইএসের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের পর ইরাকে সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও দেশটির আশপাশের অঞ্চলে সংঘাত ও অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।
২০১৪ সালে আইএস ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করার পর বাগদাদের অনুরোধে মার্কিন বাহিনী আবার ইরাকে ফিরে আসে। পরে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গোয়েন্দা তথ্য, বিমান নজরদারি ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা দিয়ে ইরাকি বাহিনীকে সহযোগিতা করে যুক্তরাষ্ট্র।
বর্তমানে ইরাকি সেনাবাহিনী, পুলিশ, সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনী এবং পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের বিভিন্ন ইউনিট আইএসবিরোধী অভিযানে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। দেশটির কিছু নিরাপত্তা কর্মকর্তা মনে করেন, মার্কিন সেনাদের সরাসরি উপস্থিতি না থাকলেও এসব বাহিনী অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ হুমকি মোকাবিলা করতে সক্ষম।
তবে ইরাকের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এখনো সীমিত। ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ড্রোন, রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় এই ঘাটতি বড় দুর্বলতা হয়ে উঠতে পারে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ সতর্ক করেছেন।
বিশেষ করে ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলের কর্মকর্তারা মার্কিন সেনা প্রত্যাহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চলতি বছরে ওই অঞ্চলে ইরান ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এসব হামলা ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছে।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও বাগদাদের সম্পর্কের ধরনও পরিবর্তিত হওয়ার কথা রয়েছে। দুই দেশ সামরিক উপস্থিতির পরিবর্তে অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে সম্পর্ককে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। দেশটির পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প সম্প্রসারণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি সরবরাহের নতুন পথ তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জুলাইয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকেও ইরাকের তেল ও অন্যান্য খাতে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চুক্তির বিষয়ে আলোচনা হয়।
তবে আঞ্চলিক সংঘাত অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক সহযোগিতার গতি ব্যাহত হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। একই সঙ্গে ইরাককে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিজেদের অবস্থানও সামলে চলতে হবে।
মার্কিন সেনাদের বিদায়ের পর ইরাক এখন এমন এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে দেশের নিরাপত্তা, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব আরও বেশি বাগদাদের ওপর বর্তাবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক থেকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদারত্বে রূপান্তরের সক্ষমতাও আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠবে।