- ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্রবন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধের মুখে ইরান তেল রপ্তানি ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য বিকল্প পথ খুঁজছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের উত্তর উপকূলের কাস্পিয়ান সাগরকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিকল্প প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে তেহরান। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানির স্তর কমে যাওয়া, বন্দর সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও স্থলসীমান্তে দীর্ঘ জটের কারণে এই পথ সহজ সমাধান নয়।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাতেও বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। জাতিসংঘের উদ্যোগে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চললেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছেন। ফলে দক্ষিণের সমুদ্রপথে বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
কাস্পিয়ান সাগর বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্থলবেষ্টিত জলভাগ। ইরান ছাড়াও রাশিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান ও তুর্কমেনিস্তান এই সাগরের সঙ্গে যুক্ত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পানির স্তর ক্রমাগত কমে যাওয়ায় এই পথে নৌবাণিজ্য পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ইনগার অ্যান্ডারসেন চলতি বছরের এপ্রিলে জানিয়েছিলেন, ১৯৯০-এর দশক থেকে কাস্পিয়ান সাগরের পানির উচ্চতা প্রায় দুই মিটার কমেছে। শতাব্দীর শেষ নাগাদ আরও ৮ থেকে ২১ মিটার পর্যন্ত পানি কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের পরিবেশ অধিদপ্তরের উপকূলীয় ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষা বিভাগের মহাপরিচালক শাহরাম ফাদাকারও সম্প্রতি জানান, গত দুই থেকে তিন বছরে কাস্পিয়ান সাগরের পানির স্তর বছরে ২০ সেন্টিমিটারের বেশি করে কমেছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর। ইরানের শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসউদ পোলমেহের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে উত্তরাঞ্চলের বন্দরগুলোতে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টন ওজনের জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হলেও পানির গভীরতা কমে এখন প্রায় ৪ হাজার টনের জাহাজ পরিচালনা করা যাচ্ছে।
দক্ষিণের সমুদ্রপথের ওপর চাপ বাড়ায় ইরান স্থলসীমান্ত ও কাস্পিয়ান রুটে বাণিজ্য সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু এতে সীমান্ত এলাকাতেও তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
ইরানবিষয়ক গবেষক ভালি কালেজির মতে, আর্মেনিয়া সীমান্তের নর্ডুজ ক্রসিংয়ে একসঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ট্রাক পর্যন্ত অপেক্ষা করছে। অন্যান্য সীমান্ত টার্মিনালেও ইরানে প্রবেশ করতে পণ্যবাহী যানকে ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তার মতে, এর পেছনে শুধু পণ্য পরিবহন উত্তরমুখী হওয়ার বিষয়টি দায়ী নয়। সীমিত টার্মিনাল সক্ষমতা, কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা, সড়ক অবকাঠামো এবং চলমান নির্মাণকাজও যানজট বাড়াচ্ছে। ইরানের ওপর বিমান চলাচলসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার কারণে স্থলসীমান্তে যাত্রী চাপ বেড়ে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
ইরানের উত্তরাঞ্চলের আনজালি, আমিরাবাদ ও নওশাহর বন্দরগুলো দিয়ে ঠিক কত পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে এসব বন্দরের গুরুত্ব বেড়েছে।
ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ শাকিবি-নাসাব জানিয়েছেন, দেশের মোট নামমাত্র বন্দর সক্ষমতা প্রায় ৩০ কোটি টন। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর সক্ষমতা মাত্র ৩ কোটি টনের মতো।
যুদ্ধের আগে প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর অংশ ছিল প্রায় ১৮ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের বন্দরগুলোর সক্ষমতায় বড় পার্থক্য রয়েছে। শাকিবি-নাসাবের মতে, দক্ষিণাঞ্চলের একটি বড় জাহাজ যে পরিমাণ পণ্য বহন করতে পারে, একই পরিমাণ পণ্য কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে নিতে প্রায় ২০টি জাহাজ প্রয়োজন হতে পারে।
কাস্পিয়ান রুটকে কার্যকর করতে ইরান আঞ্চলিক রেল ও নৌ যোগাযোগ সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। চীনের আকতাউ হয়ে উত্তর ইরানের পথে পণ্য পরিবহনের একটি রুটও গুরুত্ব পাচ্ছে। এই ব্যবস্থায় চীন থেকে রেলপথে কাজাখস্তানের আকতাউ পর্যন্ত পণ্য নেওয়ার পর কাস্পিয়ান সাগর পেরিয়ে ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরে পৌঁছানো সম্ভব।
একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে রাশত-আস্তারা রেলপথের অসম্পূর্ণ অংশগুলো শেষ করার উদ্যোগও নিচ্ছে তেহরান। এই রেলপথ চালু হলে ইরান, আজারবাইজান ও রাশিয়াকে যুক্ত করা আন্তর্জাতিক নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডরের পশ্চিম অংশ আরও কার্যকর হতে পারে।
কাস্পিয়ান রুটে বাণিজ্য বাড়ানোর ফলে ইরানের রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপরও বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে রুশ অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে পণ্য পরিবহন করলে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বোরস অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষক এজানা তেদলা বলেন, রাশিয়ার অবকাঠামোর সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত হলে ইউক্রেনের হামলার কারণে সৃষ্ট সরবরাহ বিঘ্নের ঝুঁকিও বাড়বে।
ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে আমদানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরও একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো অবকাঠামো ও জাহাজের সক্ষমতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভারী পণ্য আমদানি করার মতো পর্যাপ্ত বন্দর অবকাঠামো ও জাহাজ ইরানের নেই।
এ ছাড়া ইরানের বড় রপ্তানি পণ্য জ্বালানি, তেল ও লৌহ আকরিক মূলত ভারী ও বিপুল পরিমাণের পণ্য। এসব পণ্য দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর দিয়েই সহজে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো যায়। ফলে দক্ষিণের সমুদ্রপথ দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত থাকলে কাস্পিয়ান রুট কিছুটা চাপ কমাতে পারলেও ইরানের পুরো বৈদেশিক বাণিজ্যের বিকল্প হয়ে ওঠা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।