Friday, October 2, 2026

মালয়েশিয়া থেকে মিয়ানমারে ১,৫০০ শরণার্থী ফেরত, আতঙ্কে রোহিঙ্গারা


ছবিঃ ২৭ জুলাই, ২০২৬ তারিখে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে নিজ বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পর পুলিশি হেফাজতে একটি ট্রাকে বসে আছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। (সংগৃহীত । আল জাজিরা /হাসনূর হোসেন/রয়টার্স)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

মালয়েশিয়া থেকে মিয়ানমারের প্রায় ১ হাজার ৫০০ শরণার্থীকে ফেরত পাঠানোর পর দেশটিতে থাকা হাজারো শরণার্থীর মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, পরবর্তী দফায় কাদের মিয়ানমারে পাঠানো হবে এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

মঙ্গলবার প্রায় ১ হাজার ৪৭৬ জনকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটির সরকারের সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের করা একটি সমঝোতার আওতায় অন্তত ৫ হাজার শরণার্থীকে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

মালয়েশিয়ায় বসবাসরত মিয়ানমারের শরণার্থী নেতা রাফ* জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তার ফোন প্রায় অবিরাম বেজে চলেছে। প্রতিদিন ১০০টিরও বেশি ফোন আসছে। ফোনের অপর প্রান্তে থাকা শরণার্থীরা কান্নাকাটি করে তাকে কিছু করার অনুরোধ করছেন বলে জানান তিনি।

এদিকে শরণার্থী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অভিযানও বেড়েছে। শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত এসব অভিযানে ৫০ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। জুনে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তির কথা জানানোর পর অভিযানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

মালয়েশিয়ার বেসরকারি সংস্থা রিফিউজ ফর দ্য রিফিউজিসের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হেইডি কোয়াহ বলেন, এখন প্রায় প্রতিদিনই অভিযান চলছে। কোনো কোনো দিনে   ৫০টিরও বেশি অভিযান হচ্ছে।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুশন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, চলতি বছরের শুরু থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ হাজার ৭০০টির বেশি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৭টি অভিযান হয়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ার অভিবাসন ডিপোগুলোতে ১০ হাজারের বেশি মিয়ানমারের নাগরিক আটক রয়েছেন বলেও জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় মোট ২ লাখ ১৫ হাজারের বেশি শরণার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজারই মিয়ানমারের নাগরিক। এদের মধ্যে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি। এছাড়া চিন সম্প্রদায়ের প্রায় ১৬ হাজার এবং মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর প্রায় ৩৩ হাজার মানুষ রয়েছেন।

মঙ্গলবার ফেরত পাঠানো প্রথম দফার প্রায় দেড় হাজার মানুষের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করা যায়নি বলে জানিয়েছেন মিয়ানমারের শরণার্থী নেতারা। তাদের ভাষ্য, প্রথম দফায় ফেরত পাঠানোদের অনেকেই মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সদস্য। তাদের অনেকের বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্র থাকায় প্রত্যাবাসন তুলনামূলক সহজ হয়েছে বলে মনে করছেন শরণার্থী নেতারা।

রাফ বলেন, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি জটিল। কারণ মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে আসছে। ফলে দেশটি সব রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে রাজি হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়ন ও সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালে সামরিক অভিযানের পর কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে যান। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অনেকেই ওই ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এদিকে মালয়েশিয়ায় শরণার্থীবিরোধী বক্তব্যও সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। মিয়ানমারের শরণার্থী নেতাদের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শরণার্থী অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি করা কিছু ভিডিওর পর এসব এলাকায় অভিযান বেড়েছে। থ্রেডস, টিকটক ও ফেসবুকে এমন ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বলে তারা দাবি করেন। তবে এসব ভিডিও ও সরকারি অভিযানের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

শরণার্থীদের সহায়তায় কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, তাদের জন্য সহায়তার পরিমাণও কমে গেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি বন্ধ হওয়ার পর মালয়েশিয়ায় শরণার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা কমেছে বলে দাবি করেন হেইডি কোয়াহ। একই সময়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার অর্থায়ন ও জনবলও কমেছে বলে তিনি জানান।

ইউএনএইচসিআর বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের অর্থসংকটে রয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রয়োজনীয় অর্থের বিপরীতে তাদের ঘাটতি ৫৭৯ কোটি ডলার। জুলাই পর্যন্ত প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ৩২ শতাংশ তারা পেয়েছে।

এর মধ্যেই মিয়ানমারে চলমান সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। মালয়েশিয়া থেকে শরণার্থী ফেরত পাঠানোর এক দিন আগে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। নিহতদের মধ্যে বাজারের বিক্রেতা, ক্রেতা ও পথচারী ছিলেন বলে আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার মানবাধিকার কমিশন (সুহাকাম) বলেছে, দেশটি ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের সদস্য না হলেও ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের অংশ হওয়ায় এর প্রতি দেশটির দায়বদ্ধতা রয়েছে। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন জায়গায় ফেরত পাঠানো উচিত নয় যেখানে তার নিপীড়ন, নির্যাতন বা গুরুতর ক্ষতির বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে।

মঙ্গলবার ফেরত পাঠানোদের মধ্যে ২৭ শিশু ছিল বলেও জানিয়েছে সুহাকাম। তাদের মধ্যে কয়েকজনের বয়স আট বছর বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, শিশুদের নিরাপত্তা ও সর্বোত্তম স্বার্থকে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

এদিকে মালয়েশিয়া সরকার বলছে, মিয়ানমার সরকারের দেওয়া তালিকার ভিত্তিতে প্রত্যাবাসনের জন্য লোকজন নির্বাচন করা হয়েছে। তবে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, সাম্প্রতিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের সুযোগও দেওয়া হয়নি। ফলে তারা প্রত্যাবাসন সত্যিকার অর্থে স্বেচ্ছায় হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

মালয়েশিয়ার মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, কোনো ব্যক্তির প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত স্বাধীন কোনো সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। তাদের আশঙ্কা, আটক অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের ‘স্বেচ্ছায়’ দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

এর আগে ২০১৫ সালে মালয়েশিয়া শরণার্থীদের নিবন্ধনের জন্য ‘রিফিউজি রেজিস্ট্রেশন ডকুমেন্ট’ বা ডিপিপি কর্মসূচি চালু করেছিল। শরণার্থী নেতারা বলছেন, এই নিবন্ধন ব্যবস্থার মাধ্যমে যদি কাজ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে তা মালয়েশিয়ায় সাময়িকভাবে অবস্থানরত শরণার্থীদের জন্য কার্যকর হতে পারে।

তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও অ্যাসাইলাম অ্যাকসেসের মালয়েশিয়া শাখা বলছে, সাম্প্রতিক প্রত্যাবাসন ডিপিপি কর্মসূচির উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাদের মতে, এই কর্মসূচিকে ব্যবহার করে দ্রুত ও অনিয়মিতভাবে শরণার্থীদের ফেরত পাঠানো উচিত নয়।

মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ পরবর্তী দফায় কাদের ফেরত পাঠানো হবে এবং মিয়ানমারে ফিরে তাদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হবে। মঙ্গলবারের প্রত্যাবাসনের পর সেই উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।


Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন