Tuesday, September 22, 2026

ইরানের সব বিমান সংস্থাকে আন্তর্জাতিকভাবে অচল করার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের


ছবিঃ ফ্রাঙ্কফুর্ট রাইন-মেইন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণরত ইরান এয়ারের একটি এয়ারবাস ৩৩০-২০০। (সংগৃহীত । আল জাজিরা /ফ্যাব্রিজিও গ্যান্ডোলফো/সোপা ইমেজেস ভায়া গেটি ইমেজেস)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

ইরানের বিমান সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) থেকে ইরানের সব বিমান সংস্থার কার্যক্রম বিশ্বজুড়ে বাধাগ্রস্ত করার মতো নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে পারে।

সোমবার দেওয়া বক্তব্যে বেসেন্ট বলেন, ইরানি কোনো বিমানকে জ্বালানি, অবতরণ সুবিধা কিংবা টিকিট বিক্রির মতো সেবা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে। এমনকি এসব প্রতিষ্ঠানের মার্কিন ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকারও সীমিত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

ওয়াশিংটনের এ পদক্ষেপ ইরানের ওপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের চলমান অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ইরানের ২৭টি বিমান সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, এসব বিমান সংস্থাকে ইরানের সরকার অস্ত্র, সামরিক সদস্য এবং নিষিদ্ধ পণ্য পরিবহনে ব্যবহার করে।

বিদেশে সবচেয়ে বেশি কার্যক্রম থাকা ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইরান এয়ার, মাহান এয়ার ও কেশম এয়ার। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং বিমান বহরের সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক রুটে এসব সংস্থার কার্যক্রম আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।

ইরানের অন্যতম বড় বেসরকারি বিমান সংস্থা মাহান এয়ার সম্প্রতি ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা ও মাসকাটের কয়েকটি রুটে ফ্লাইট বন্ধ করেছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানের বিমান চলাচল খাতে সহযোগিতার অভিযোগে ৩৬টি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করার পরই এ পরিবর্তন আসে।

মাহান এয়ার বর্তমানে চীন, ভারত, ইরাক, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশে ফ্লাইট পরিচালনা করে।

অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী ইরান এয়ারের ইউরোপীয় নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরেই নিষেধাজ্ঞা, পুরোনো বিমান বহর এবং যুদ্ধজনিত পরিস্থিতির কারণে সংকুচিত হয়েছে। বর্তমানে ইরাকের নাজাফ ও বাগদাদ এবং তুরস্কের ইস্তাম্বুলের সঙ্গে তাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রয়েছে।

কেশম এয়ারও তুরস্ক, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জার্মানিসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব দীর্ঘদিনের। ২০২৫ সালে ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ৪ কোটি ৬২ লাখ যাত্রী আকাশপথে যাতায়াত করেন। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক যাত্রীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের প্রায় ৭২ লাখ ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর ফ্লাইট ব্যবহার করেছিলেন।

তবে চলমান সংঘাত ও নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সক্ষমতা ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিমান চলাচলবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের হিসাবে, চলতি বছরের আগস্টে ইরানের আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সক্ষমতা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৯ শতাংশ কম ছিল।

ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে ইস্তাম্বুল, নাজাফ, বাগদাদ, দুবাই, নয়াদিল্লি, লাহোর, বেইজিং, সাংহাই, গুয়াংজু, শেনঝেন ও ফুকেটের মতো বিমানবন্দরগুলোতে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।

কারণ এসব গন্তব্যে ইরানি বিমান সংস্থাগুলো স্থানীয় জ্বালানি, বিমানবন্দর সেবা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এবং টিকিট বিক্রির অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অন্য দেশের আকাশসীমা ইরানি বিমানগুলোর জন্য বন্ধ করে দিতে পারে না। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান ইরানি বিমানকে জ্বালানি, অবতরণ, রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কিংবা আর্থিক সেবা দেয়, তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে বিমান সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক কার্যক্রম সীমিত করার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।

তবে সব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বিমান চলাচল বিশ্লেষক সাজ আহমদ মনে করেন, ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক থাকায় ইরাক ও পাকিস্তান মার্কিন চাপের বিরোধিতা করতে পারে। চীনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অবস্থান প্রত্যাশা করছেন তিনি।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন মঙ্গলবার বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে বেইজিং।

তুরস্কও অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্পর্কের কারণে ইরানি বিমান সংস্থার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপে অনাগ্রহী হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কাছাকাছি যেতে পারে বলে মত রয়েছে।

ইরানের বিমান চলাচল ব্যবস্থা আরও সংকুচিত হলে যাত্রীদের একটি অংশ প্রতিবেশী দেশগুলোর বিমানবন্দর ব্যবহার করতে বাধ্য হতে পারেন। লেবাননভিত্তিক বিমান চলাচল পরামর্শক মাজেন সাম্মাকের মতে, তুরস্ক, ইরাক, আর্মেনিয়া ও পাকিস্তানের মতো দেশে স্থল বা সমুদ্রপথে গিয়ে সেখান থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ধরার প্রবণতা বাড়তে পারে।

তবে এতে যাত্রার সময় ও খরচ দুটিই বাড়বে। একই সঙ্গে ইস্তাম্বুল, দোহা, মাসকাট ও দুবাইয়ের মতো আঞ্চলিক বিমান চলাচল কেন্দ্রগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

ইরানের বিমান সংস্থাগুলোর জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হতে পারে বিমান রক্ষণাবেক্ষণ। নিষেধাজ্ঞার কারণে যন্ত্রাংশ ও প্রয়োজনীয় সেবা সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়লে পুরোনো বিমান বহরের আরও একটি অংশ বসে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

স্কট বেসেন্টের ‘ডলার ব্যবস্থা থেকে বের করে দেওয়া’র হুমকির অর্থ হলো—ইরানি বিমান সংস্থাগুলোকে সেবা দেওয়া কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানও মার্কিন আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে।

এর আওতায় বিমানবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি সরবরাহকারী, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কোম্পানি কিংবা টিকিট বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান পড়তে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা ও ডলার লেনদেনে প্রবেশাধিকার সীমিত করা হলে আন্তর্জাতিক ব্যবসায় তাদের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।

ইরানের বিমান চলাচল খাত এমনিতেই পুরোনো বিমান, যন্ত্রাংশের সংকট এবং দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট কমে যাওয়ার পাশাপাশি ভাড়া বাড়া এবং যাত্রীদের বিকল্প পথে যাতায়াতের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের ধারণা।

অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি এ পদক্ষেপ ইরানের সাধারণ যাত্রী, বিমান সংস্থা ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর জন্য কতটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন