Tuesday, September 22, 2026

ইরান যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে ছয় উপসাগরীয় দেশের নেতারা


ছবিঃ সৌদি আরবের রিয়াদে মে ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-জিসিসি (GCC) শীর্ষ সম্মেলনে উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডান দিক থেকে তৃতীয়) (সংগৃহীত । আল জাজিরা /উইন ম্যাকনামি/গেটি)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ প্রায় সাত মাসে গড়িয়েছে। এরই মধ্যে যুদ্ধের প্রভাব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে আলোচনায় বসতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছেন উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসির ছয় দেশের নেতারা।

মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনের ফাঁকে এ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানের নেতারা অংশ নেবেন। ইরান যুদ্ধের পরবর্তী ধাপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগই আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি বিভিন্ন বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর প্রভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নৌ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছে।

এর আগে জুনে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধের জেরে সেই উদ্যোগ ভেঙে যায়। ফলে নতুন করে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ছয়টি উপসাগরীয় দেশের অবস্থানে কিছু পার্থক্য থাকলেও যুদ্ধের আরও বিস্তার ঠেকানো এবং আঞ্চলিক নৌপথ সচল রাখা তাদের অভিন্ন উদ্বেগ।

দোহাভিত্তিক নিউ গ্রাউন্ড রিসার্চের গবেষক লুসিয়ানো জাকারার মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বেশ কিছু অভিন্ন অবস্থান রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের মার্কিন সামরিক অভিযান হলে এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো ওয়াশিংটনকে সতর্ক করতে পারে।

গালফ স্টেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী জর্জিও কাফিয়েরোও মনে করেন, নতুন করে সংঘাত তীব্র হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো ও অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। তাই তারা জুনের সমঝোতার ভিত্তিতে নতুন কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগের পথ খোঁজার চেষ্টা করতে পারে।

এশিয়া গ্রুপের গালফ অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ হেলালের মতে, হরমুজ ও লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা উপসাগরীয় দেশগুলোর অন্যতম প্রধান দাবি হতে পারে।

যুদ্ধের প্রভাব ছয়টি দেশের ওপর সমান নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ফুজাইরাহ বন্দরে তেল পাঠানোর জন্য পাইপলাইন ব্যবহার করতে পারলেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রপ্তানি চালিয়ে যেতে পারছে না।

অন্যদিকে কাতারের জ্বালানি রপ্তানির বড় অংশ হরমুজ প্রণালিনির্ভর হওয়ায় দেশটির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি সম্প্রতি যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবকে ‘ভূমিকম্পের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।

সৌদি আরবের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ ইয়েমেন। ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর সংঘাতও নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে হুথিদের তৎপরতা বাড়ায় আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

বৈঠকের আগে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে তিনি একটি ‘বড় সিদ্ধান্তের’ মুখোমুখি। তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাদের মতামত জানতে চান। এর আগে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের সামনে মূলত দুটি বিষয়—ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ অব্যাহত রাখা নাকি নতুন করে আলোচনার পথ তৈরি করা। যুদ্ধ আরও বাড়লে তেলের সরবরাহ ও দাম, উপসাগরীয় অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণেও জুনের সমঝোতার আদলে নতুন কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মতো বিষয়কে সম্ভাব্য কূটনৈতিক পথ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বড় সমঝোতা আসবে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত কোনো ইঙ্গিত নেই। বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ফল হতে পারে আলোচনার পথ পুনরায় চালু করা এবং কাতার বা পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরবর্তী সংলাপের সুযোগ তৈরি করা।

এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিচ্ছেন। ফলে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি নতুন কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগের সম্ভাবনাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।


Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন