- ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের অর্থনীতি নতুন চাপের মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তেহরান এখন উপসাগরীয় সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে স্থল ও রেলভিত্তিক বিকল্প বাণিজ্যপথের দিকে ঝুঁকছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ইরান এখন কাস্পিয়ান সাগরকেন্দ্রিক রেলওয়ে নেটওয়ার্ক, উত্তর-দক্ষিণ বাণিজ্য করিডর এবং নিষেধাজ্ঞা-পরবর্তী বিকল্প বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে “দৃঢ় ও অটল” বলে উল্লেখ করেন এবং বাণিজ্য, নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসার পর থেকেই ইরান-রাশিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই দেশই বিকল্প আর্থিক ও বাণিজ্যিক কাঠামোর দিকে ঝুঁকে পড়ে।
বর্তমানে ইরান ও রাশিয়ার বাণিজ্যে প্রধানত কৃষিপণ্য, শস্য, ধাতু, যন্ত্রপাতি এবং শিল্প কাঁচামাল অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন প্রযুক্তি আদান-প্রদানের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
রুশ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও তা এখনো ইরানের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীন বা উপসাগরীয় দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দুই দেশের শিল্প কাঠামো অনেকটা একই ধরনের হওয়ায় বড় পরিসরে বাণিজ্য সম্প্রসারণ সীমিত। ফলে ইরানের জন্য রাশিয়া পুরোপুরি বিকল্প অর্থনৈতিক সহায়তা হয়ে উঠতে পারছে না।
অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর (INSTC) নামে পরিচিত একটি বহুমুখী রেল ও নৌপথ প্রকল্পকে দুই দেশের প্রধান বিকল্প বাণিজ্য রুট হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পথে রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল থেকে কাস্পিয়ান সাগর হয়ে ইরানে পণ্য পরিবহন করা হয়, যা পরে স্থলপথে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পৌঁছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই করিডর সমুদ্রপথের বিকল্প হিসেবে কার্যকর হলেও এটি পুরোপুরি সমুদ্র বাণিজ্যের সক্ষমতা পূরণ করতে পারবে না। কারণ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে যে পরিমাণ পণ্য পরিবহন হয়, তার তুলনায় স্থলপথের সক্ষমতা অনেক সীমিত।
তাদের মতে, ইরানের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই সমুদ্রপথনির্ভর, যা রাতারাতি স্থলপথে স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ধীরগতি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে রাশিয়া নিজেও অর্থনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানকে বড় ধরনের সহায়তা দিতে সীমাবদ্ধতা অনুভব করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে, ইরান-রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও হরমুজ সংকটের বিকল্প হিসেবে রেল ও স্থলপথ এখনো সীমিত সক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে—এমনটাই বলছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।