Sunday, August 9, 2026

হরমুজ প্রণালি খুলতে যুক্তরাষ্ট্রের ছাড় চায় ইরান, ওমানের সঙ্গে সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত


ছবিঃ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ বিষয়ক ব্যবস্থা নিয়ে ইরান পর্যালোচনা করছে (সংগৃহীত । আল জাজিরা)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় প্রায় পৌঁছে গেছে ইরান। তবে প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে বলে জানিয়েছে তেহরান।

শনিবার (৮ আগস্ট) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, ওমানের সঙ্গে এ বিষয়ে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন তার দেওয়া অঙ্গীকার মেনে চলছে কি না, তার ওপরই হরমুজ পুরোপুরি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বিও হরমুজ প্রণালি নিয়ে তেহরানের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে এবং এটি ইরান-ওমানের আলোচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।

তার ভাষ্য, হরমুজ শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের একটি পথ নয়; ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শক্তির উৎস। তাই প্রণালি খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের নির্ধারিত শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সামনে অন্য কোনো পথ থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

একই সঙ্গে ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানিয়েছে আইআরজিসি। মোহেব্বি বলেন, আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

ইরানের কট্টরপন্থী-প্রভাবিত পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের মুখপাত্র হাসান কাশকাভিও শুক্রবার জানান, হরমুজ নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতার কাঠামোতে একমত হয়েছে দুই পক্ষ। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

সমঝোতার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট রুট নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে সমন্বয় হয়েছে বলে জানা গেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রণালিতে প্রবেশকারী জাহাজগুলো ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে উত্তর দিকের একটি পথে চলবে। অন্যদিকে বেরিয়ে যাওয়া জাহাজগুলো ওমানের জলসীমার দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট ব্যবহার করবে। তবে পুরো ব্যবস্থাপনাই ইরানের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।

মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক সমঝোতাটি ৬০ দিনের জন্য কার্যকর হতে পারে এবং প্রয়োজন হলে এর মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব। কেন্দ্রীয় একটি নৌপথ থেকে মাইন অপসারণ, ভবিষ্যতে সামরিক জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা এবং জাহাজ পারাপারে সমন্বিত ফি কাঠামো নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধের বিষয়টি কীভাবে সমাধান হবে এবং মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কতটা কমানো হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তেহরান এর আগে এসব পদক্ষেপকে প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বিশ্বের স্বাভাবিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরান ও ওমানের আলোচনাকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা কিছুটা কমলেও হরমুজ ও আশপাশের সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এখনো রয়েছে।

শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (এডিএনওসি) একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং হরমুজকে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে এর নিন্দা করেছে।

এদিকে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিরাও সৌদি আরবের সঙ্গে উত্তেজনায় জড়িয়ে রয়েছে। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচলেও এর প্রভাব পড়ছে।

সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব—দুই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথেই জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। পরে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরলেও যুদ্ধপূর্ব সময়ের মতো নির্বিঘ্ন পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা বাড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শুক্রবারের লেনদেন শেষে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৩ ডলারে অবস্থান করছিল।

ইরানের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। শনিবার দেশটির জাতীয় মুদ্রা মার্কিন ডলারের বিপরীতে কিছুটা শক্তিশালী হয়ে প্রায় ১৮ লাখ ৫০ হাজার রিয়ালে দাঁড়ায়। এর আগে গত সপ্তাহে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দর প্রায় ১৯ লাখ ৪০ হাজারে নেমে রেকর্ড দুর্বলতায় পৌঁছেছিল।

তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকও ১ লাখ ১২ হাজার পয়েন্টের বেশি বেড়ে ৫৫ লাখ ২০ হাজার পয়েন্টে পৌঁছেছে।

তবে হরমুজ প্রণালির পূর্ণাঙ্গ পুনরায় খোলা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক উপস্থিতি নিয়ে দুই দেশের মতপার্থক্য দূর না হলে সাময়িক সমঝোতা কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন