- ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রেও বড় চাপ তৈরি করেছে। সংকটের মূল দুই কেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে ইরানের দক্ষিণে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্র হোয়াইট হাউস।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্ব ব্যাংক-এর বসন্তকালীন বৈঠকে বিশ্বের শীর্ষ অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের প্রতিনিধিরা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের হলেও এর অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে হচ্ছে পুরো বিশ্বকে।
বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী রাচেল রিভস এই যুদ্ধকে “অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত” হিসেবে উল্লেখ করেন। একই ধরনের উদ্বেগ উঠে আসে জি৭ ও জি২০-এর বৈঠকগুলোতেও, যেখানে বেশিরভাগ দেশ পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদী অবস্থান তুলে ধরে বলেন, বাজার ও অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। তবে এই আশাবাদে অনেকেই একমত নন।
কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন সতর্ক করে বলেন, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও জ্বালানি নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করবে, এমনকি যুদ্ধ শেষ হলেও এর প্রভাব থেকে যাবে।
এদিকে, ক্রিস্টালিনা জর্জিভা পরিস্থিতিকে “ধীরে ধীরে আসা বড় ধাক্কা” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, মার্চের তুলনায় এপ্রিল আরও কঠিন হতে পারে, কারণ নতুন জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গ বিশেষভাবে দরিদ্র দেশগুলোর ওপর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইরাকের মতো দেশ যেখানে তেল আয়ের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশসহ অনেক দেশ জ্বালানি আমদানিতে সমস্যার মুখে পড়েছে, যা দৈনন্দিন জীবন ও শিল্পে চাপ সৃষ্টি করছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের একটি সহায়তা তহবিল প্রস্তুত করেছে, যাতে জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামাল দেওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, জ্বালানির পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহেও বড় সংকট দেখা দিতে পারে। সার উৎপাদনের মূল উপাদান ইউরিয়ার দাম ইতোমধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে, যা আগামী মাসগুলোতে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এই পরিস্থিতিকে স্বল্পমেয়াদি সমস্যা হিসেবে দেখছে এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য এই চাপ সহনীয় বলে মনে করছে।
ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোল্যান্ড লেস্কিউর বলেন, এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালী এবং এটি স্বাভাবিক না হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
এদিকে, যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড-এর গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি জানিয়েছেন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তড়িঘড়ি সুদের হার বাড়ানো ঠিক হবে না; বরং উত্তেজনা কমানোই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে প্রণালী পুনরায় চালু হওয়ায় জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে, তবুও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা কাটেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট সত্যিই শেষ হয়েছে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয় আর যদি না হয়, তাহলে এর প্রভাব হতে পারে আরও ভয়াবহ।
তথ্যসুত্রঃ বিবিসি নিউজ