Thursday, April 23, 2026

হাম পরিস্থিতি অবনতির পথে: দ্রুত বাড়ছে আক্রান্ত, জোরদার টিকাদান কার্যক্রম


ছবিঃ হামের লক্ষনে শিশুরা হাস্পাতেলে ভর্তি (সংগৃহীত)

বিশেষ প্রতিবেদক | আরাফাত হাবিব

বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরে নিয়ন্ত্রণে থাকা হাম (মিজলস) রোগ আবারও নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে যে সংক্রমণ সীমিত আকারে ছিল, তা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দ্রুত বেড়ে এখন বিস্তৃত জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যে প্রায় ১০ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যার মধ্যে ৮০০-এর বেশি সংক্রমণ পরীক্ষাগারে নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে—শতাধিক শিশুর প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে, এবং বিভিন্ন এলাকায় গুরুতর জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যানচিত্র—

  • মোট সন্দেহভাজন রোগী: প্রায় ৯,৮০০–১০,০০০ জন

  • নিশ্চিত সংক্রমণ: ৮০০+

  • সন্দেহভাজন মৃত্যু: ১০০–১২০ জনের বেশি

  • হাসপাতালে ভর্তি: ৪,৬০০-এর বেশি

  • নতুন আক্রান্তের হার: গত কয়েক সপ্তাহে দ্রুত বৃদ্ধি

এই প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে শিশুদের ওপর। সর্বশেষ বিশ্লেষণ বলছে, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই পাঁচ বছরের নিচের শিশু। এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৬৫–৭০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এমনকি ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরাও উল্লেখযোগ্য হারে সংক্রমিত হচ্ছে, যারা সাধারণত পূর্ণ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসে না। চিকিৎসকদের মতে, এই বয়সী শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম থাকায় তাদের মধ্যে জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি বেশি।

ভৌগোলিকভাবে সংক্রমণ এখন প্রায় সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক আপডেট অনুযায়ী, ৬৪ জেলার মধ্যে অন্তত ৫৬ জেলায় হাম শনাক্ত হয়েছে এবং নতুন নতুন এলাকাও সংক্রমণের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। রাজধানীকেন্দ্রিক ঢাকা বিভাগ এখনো সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হলেও উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি বিভাগে সংক্রমণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রাজশাহী, ময়মনসিংহ এবং বরিশাল বিভাগের বেশ কিছু জেলায় ক্লাস্টার আকারে সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে অন্তত ২০টি জেলার প্রায় ৩০টি এলাকাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ “হটস্পট” হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে নিবিড় নজরদারি ও বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

এলাকাভিত্তিক হালনাগাদ চিত্র—

  • আক্রান্ত জেলা: ৫৬টি (ক্রমশ বাড়ছে)

  • হটস্পট এলাকা: ২০ জেলার প্রায় ৩০টি অঞ্চল

  • সর্বোচ্চ সংক্রমণ: ঢাকা বিভাগ

  • দ্রুত বিস্তারমান অঞ্চল: রাজশাহী, ময়মনসিংহ, বরিশাল

সংক্রমণের প্রবণতায় যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা বিশেষজ্ঞদের কাছে উদ্বেগজনক। কয়েক বছর আগেও যেখানে হাম রোগের সংক্রমণ হার প্রতি ১০ লাখে ১ জনের নিচে ছিল, সেখানে এখন তা বেড়ে প্রায় ১৬–১৭ জনে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি একটি “রিসার্জেন্স” বা পুনরুত্থান, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দেশের টিকাদান ব্যবস্থায় একটি বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে।

এই ফাঁকের পেছনে মূলত কয়েকটি কারণকে দায়ী করা হচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি। ফলে একটি বড় ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে, যা এখন সংক্রমণের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। পাশাপাশি, কিছু এলাকায় টিকাদান কভারেজ তুলনামূলক কম থাকায় সেসব অঞ্চল সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ‘জিরো ডোজ’ শিশু—অর্থাৎ যারা একবারও টিকা পায়নি—তাদের সংখ্যাও বেড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে জরুরি প্রতিক্রিয়া শুরু করেছে এবং সাম্প্রতিক আপডেটে সেই কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান অভিযান চালানো হচ্ছে, বিশেষ করে চিহ্নিত হটস্পট এলাকাগুলোতে বাড়তি টিম মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকা দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দ্রুত শনাক্তকরণ, আইসোলেশন এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হচ্ছে।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রাদুর্ভাব সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় চ্যালেঞ্জ সামনে রয়েছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, পিছিয়ে পড়া শিশুদের আওতায় আনা এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ছাড়া এই ধরনের পুনরুত্থান ঠেকানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে টিকাদান নিয়ে যে অনীহা বা তথ্যের ঘাটতি রয়েছে, তা দ্রুত দূর করা প্রয়োজন।

বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগও কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, যদি স্বাস্থ্যব্যবস্থার কোনো স্তরে শৈথিল্য দেখা দেয়। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সমন্বিত ও শক্তিশালী পদক্ষেপ না নিলে হাম প্রাদুর্ভাব আরও বিস্তৃত হয়ে দেশের জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।


Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন