- ১০ জানুয়ারি, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
গত দুই সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) জুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া নগ্ন ছবির বিস্তার নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ইলন মাস্কের মালিকানাধীন এক্স-এর সঙ্গে যুক্ত গোক (Grok) নামের এআই চ্যাটবট ব্যবহার করে অনুমতি ছাড়াই অসংখ্য নারীর নগ্ন ছবি তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এই ভুক্তভোগীদের তালিকায় রয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মডেল ও অভিনেত্রী, সংবাদমাধ্যমের পরিচিত মুখ, অপরাধের শিকার নারী এমনকি কয়েকজন বিশ্বনেতাও। গবেষণা প্রতিষ্ঠান কপিলিকসের ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি মিনিটে গড়ে একটি করে এমন ছবি পোস্ট করা হচ্ছিল। তবে পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারির ৫ ও ৬ তারিখে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬ হাজার ৭০০টি এ ধরনের ছবি অনলাইনে ছড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে এক্স ও গোকের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান xAI। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া কীভাবে এমন একটি শক্তিশালী ইমেজ-জেনারেশন টুল উন্মুক্ত করা হলো। প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতাও এই ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে।
সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন। বৃহস্পতিবার কমিশন xAI-কে গোক চ্যাটবট সংক্রান্ত সব নথি সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। যদিও এটি সরাসরি নতুন তদন্ত শুরুর ঘোষণা নয়, তবে সাধারণত এমন নির্দেশ ভবিষ্যৎ তদন্তের ইঙ্গিত দেয়। বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে, কারণ সিএনএনের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে—গোকের ওপর কিছু নিরাপত্তা সীমা আরোপ ঠেকাতে ইলন মাস্ক নিজেই হস্তক্ষেপ করেছিলেন।
এদিকে, এক্সের পক্ষ থেকে গোকের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নিয়ে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। তবে গোকের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টের পাবলিক মিডিয়া ট্যাব সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এক্স সেফটি টিম এক বিবৃতিতে শিশুদের যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট তৈরিতে এআই ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, অবৈধ কনটেন্ট তৈরিতে গোক ব্যবহার করলে ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যেমনটি সরাসরি অবৈধ কনটেন্ট আপলোডের ক্ষেত্রে নেওয়া হয়।
যুক্তরাজ্যেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দেশটির যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকম জানিয়েছে, তারা xAI-এর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং প্রয়োজনে দ্রুত মূল্যায়ন করে তদন্ত শুরু করবে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক রেডিও সাক্ষাৎকারে ঘটনাটিকে “লজ্জাজনক” ও “ঘৃণ্য” আখ্যা দিয়ে অফকমকে পূর্ণ সমর্থনের কথা জানান।
অস্ট্রেলিয়ায় ই-সেফটি কমিশনার জুলি ইনম্যান-গ্রান্ট জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে গোক সংক্রান্ত অভিযোগ দ্বিগুণ হয়েছে। তবে এখনই xAI-এর বিরুদ্ধে সরাসরি পদক্ষেপ না নিয়ে সম্ভাব্য সব নিয়ন্ত্রক উপায় খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন তিনি।
সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে এক্সের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে ভারত। সেখানে একজন সংসদ সদস্য গোকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। এর পর ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ন্ত্রক সংস্থা মেইটি (MeitY) এক্সকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয়, যা পরে ৪৮ ঘণ্টা বাড়ানো হয়। এক্স ৭ জানুয়ারি একটি প্রতিবেদন জমা দিলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা এতে সন্তুষ্ট হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। অসন্তুষ্ট হলে ভারতে এক্স তার ‘সেফ হারবার’ সুবিধা হারাতে পারে, যা দেশটিতে তাদের কার্যক্রমে বড় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, গোক বিতর্ক শুধু একটি প্ল্যাটফর্মের সমস্যা নয়; এটি বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।