- ১৫ আগস্ট, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা। এই চাহিদা মেটাতে সৌর ও বায়ুশক্তির পাশাপাশি এবার প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছে অ্যামাজন, গুগল, মেটা ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টরা। তবে এই কৌশল ভবিষ্যতে তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নোরেভা।
প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে আগামী কয়েক বছরে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বর্তমানের তুলনায় প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। একদিকে এআই ডেটা সেন্টারের কারণে গ্যাসের চাহিদা বাড়বে, অন্যদিকে দেশটির গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির গতি কমে আসা এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি বাড়ার ফলে বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
নোরেভার প্রধান নির্বাহী পিটার গার্ডেটের মতে, জ্বালানি বাজারে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ধরে নিয়েছেন যে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বড় ধরনের উত্থানের মুখে পড়বে না। কিন্তু চাহিদা ও সরবরাহের হিসাব বলছে, সামনে গ্যাসের বাজার অনেক বেশি সংকুচিত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এআই অবকাঠামো তৈরির দৌড়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
মেটা লুইজিয়ানায় ৭.৫ গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিশাল গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হাইপেরিয়ন ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা।
এর পর মাইক্রোসফট ও গুগলও টেক্সাসে গিগাওয়াট-পর্যায়ের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। অ্যামাজনও টেক্সাসে প্রায় ৭.৬ গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা করছে।
এতদিন বড় ধরনের অবকাঠামো বিনিয়োগে তুলনামূলক সতর্ক থাকা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআইয়ের কারণে এখন সরাসরি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বাজারের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ছে। নোরেভার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্যাসের দামের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের পদক্ষেপ স্বাভাবিক বড় বিদ্যুৎ ক্রেতাদের তুলনায় অনেক বেশি আগ্রাসী।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (MMBtu) প্রায় ২ থেকে সাড়ে ৪ ডলারের মধ্যে রয়েছে। লুইজিয়ানার হেনরি হাবেও দাম ৩ ডলারের কাছাকাছি।
তবে নোরেভার পূর্বাভাস অনুযায়ী, কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস সরবরাহকেন্দ্রে দাম দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রতি MMBtu ১০ ডলারের ওপরে উঠে যেতে পারে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে জ্বালানি। ফলে গ্যাসের দাম দ্বিগুণ বা তিন গুণ হলে নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে ডেটা সেন্টার পরিচালনার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত এআই সেবার খরচে পড়তে পারে।
অন্যদিকে উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আবার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করে, তাহলে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির চাপ সাধারণ গ্রাহকদের ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নোরেভার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। পুরোনো কূপগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন সরবরাহ যুক্ত হওয়ায় বাজারে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়নি।
কিন্তু পরিস্থিতি এখন বদলাচ্ছে। নতুন কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলনের ব্যয় বাড়ছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির গতিও আগের মতো নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এআই ডেটা সেন্টারের দ্রুত বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ চাহিদা।
বিশেষ করে টেক্সাসের পশ্চিমাঞ্চলে এতদিন তেল উত্তোলনের সময় উপজাত হিসেবে পাওয়া বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি হতো। পর্যাপ্ত পাইপলাইন না থাকায় উৎপাদকরা অনেক সময় কম দামে গ্যাস বিক্রি করতে বাধ্য হতেন।
এখন নতুন পাইপলাইন তৈরি হওয়ায় সেই গ্যাস জাতীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজারেও যাচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজার ধীরে ধীরে বৈশ্বিক গ্যাস বাজারের সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত হচ্ছে।
গার্ডেটের মতে, একটি অঞ্চলে গ্যাসের সরবরাহ ও অন্য অঞ্চলে ঘাটতির পার্থক্য ভবিষ্যতে দামের বড় ব্যবধান তৈরি করতে পারে। আর সেই ব্যবধানের কারণেই কিছু অঞ্চলে গ্যাসের দাম দীর্ঘ সময় ১০ ডলারের ওপরে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
গ্যাসের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয়ই বাড়াবে না, ডেটা সেন্টার নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগও বাড়াতে পারে।
ইতোমধ্যে বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে ডেটা সেন্টারগুলোর প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে জনমত তৈরি হয়েছে। বিদ্যুতের বিল বাড়ার আশঙ্কায় বিপুলসংখ্যক গ্রাহক ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
ভবিষ্যতে গ্যাসের দামও যদি দ্রুত বাড়ে, তাহলে সেই চাপ বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি গ্যাসের বাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এআই অবকাঠামো তৈরির তাড়নায় প্রযুক্তি জায়ান্টরা তাই ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানির বাজারের সঙ্গে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছে। আর এই বাজারে তাদের অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম হওয়ায় ভবিষ্যতের জ্বালানি মূল্য তাদের ব্যবসায় কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।