- ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
যখন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নিউরালিঙ্ক নিজেদের ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (বিসিআই) প্রযুক্তিতে অগ্রদূত হিসেবে তুলে ধরে, তখন চীন নীরবে এই খাতে গবেষণা থেকে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে একাধিক স্টার্টআপ ইমপ্লান্টযোগ্য ও নন-ইনভেসিভ—দুই ধরনের বিসিআই প্রযুক্তি বাজারে আনার দৌড়ে নেমেছে।
চীনা উদ্যোক্তা ফিনিক্স পেং, যিনি ইমপ্লান্টভিত্তিক বিসিআই নির্মাতা নিউরোক্সেস-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং আল্ট্রাসাউন্ড-ভিত্তিক নন-ইনভেসিভ বিসিআই স্টার্টআপ জেস্টালা-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, মনে করেন—আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে বিসিআই প্রধানত স্বাস্থ্যখাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তবে বীমা কাভারেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজার বহু বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
২০২৫ সালের আগস্টে চীনের শিল্প মন্ত্রণালয় ও আরও ছয়টি সংস্থা বিসিআই উন্নয়নে একটি জাতীয় রোডম্যাপ প্রকাশ করে। এতে ২০২৭ সালের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত মাইলফলক অর্জন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
একই বছরের ডিসেম্বর মাসে শেনঝেনে আয়োজিত বিসিআই ও মানব-কম্পিউটার ইন্টারঅ্যাকশন প্রদর্শনীতে প্রায় ১১.৬ বিলিয়ন ইউয়ানের একটি ব্রেন সায়েন্স তহবিল ঘোষণার কথাও জানানো হয়, যা গবেষণা থেকে বাণিজ্যিকীকরণ পর্যন্ত কোম্পানিগুলোকে সহায়তা করবে।
চীনে বড় রোগীভিত্তি ও তুলনামূলক কম গবেষণা ব্যয়ের কারণে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থার আওতায় অনুমোদন পেলে ডিভাইসের বাজারজাতকরণও সহজ হয়। সম্প্রতি দেশটিতে সম্পূর্ণ ইমপ্লান্ট করা ও তারবিহীন বিসিআই পরীক্ষার সফলতা পাওয়া গেছে, যা বিশ্বে দ্বিতীয় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। এর আগে এমন সাফল্যের দাবি করেছিল Neuralink।
পেংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চীনে ৫০টির বেশি নমনীয় ইমপ্লান্টযোগ্য বিসিআই ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি আল্ট্রাসাউন্ড-ভিত্তিক প্রযুক্তি নিয়ে নতুন প্রজন্মের গবেষণাও এগোচ্ছে।
চীনের পরিপক্ব সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন অবকাঠামো দ্রুত প্রোটোটাইপ ও গবেষণায় সহায়তা করছে। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উভয় বিনিয়োগই বাড়ছে।
সম্প্রতি সাংহাইভিত্তিক স্টার্টআপ স্টেয়ারমেড টেকনোলজি সিরিজ-বি তহবিলে ৪৮ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। একইভাবে নিউরোটেক প্রতিষ্ঠান ব্রেইনকো হংকংয়ে আইপিওর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
চীনের সক্রিয় বিসিআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে নিউরাকল, নিউরালম্যাট্রিক্স, বো রুই কাং টেক, আয়ই টেক, ব্রেইনল্যান্ড টেক, ঝিরান মেডিকেল
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালে চীনের বিসিআই বাজার ৩.৮ বিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছাতে পারে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে তা ১২০ বিলিয়ন ইউয়ান ছাড়াতে পারে।
বিসিআই মূলত দুইভাবে বিকশিত হচ্ছে। প্রথমটি ইমপ্লান্টযোগ্য ইলেক্ট্রোফিজিওলজিক্যাল পদ্ধতি—যেখানে মস্তিষ্কে ইলেক্ট্রোড স্থাপন করে সুনির্দিষ্ট সিগন্যাল সংগ্রহ করা হয়। এটি উচ্চ নির্ভুলতা দিলেও অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি রয়েছে।
দ্বিতীয়টি নন-ইনভেসিভ পদ্ধতি—যেমন ইইজি হেডসেট—যা অস্ত্রোপচার ছাড়াই খুলি ভেদ না করে বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ শনাক্ত করে। এ ধরনের প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে দ্রুত বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী পাঁচ বছরে চীনের বিসিআই নীতিমালা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। বিশেষ করে ডেটা নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ও নৈতিকতা বিষয়ে কড়াকড়ি বাড়বে। একই সঙ্গে নন-ইনভেসিভ প্রযুক্তির অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।
ফিনিক্স পেং মনে করেন, ভবিষ্যতে বিসিআই শুধু রোগ নিরাময়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মানব মস্তিষ্ক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যে উচ্চগতির সরাসরি সংযোগ স্থাপনের সেতুবন্ধন তৈরি করবে। তাঁর ভাষায়, “নিউরোসায়েন্স ও এআই একই মুদ্রার দুই পিঠ—তাদের গভীর সমন্বয়ই আগামী প্রযুক্তি বাজারের নতুন অধ্যায় রচনা করবে।”