- ১৭ জুলাই, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা গত চার বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে চিকিৎসা ব্যয় বাবদ বৈধ পথে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল মাত্র ৩৪ লাখ মার্কিন ডলার, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলারে। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে বৈধ লেনদেন প্রায় দশ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এ প্রবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত পরিবর্তন। ২০২৫ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদেশে চিকিৎসার জন্য অর্থ পাঠানোর নিয়ম সহজ করে। নতুন নির্দেশনায় পূর্বানুমতি ছাড়াই একজন রোগী সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিদেশে পাঠানোর সুযোগ পান, যা আগে ছিল ১০ হাজার ডলার।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, হাসপাতালের নামে সরাসরি অর্থ পরিশোধ কিংবা আন্তর্জাতিক ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে এ অর্থ ব্যবহার করা যায়। পাশাপাশি নির্ধারিত সীমার মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার নগদ বহনেরও অনুমতি রয়েছে।
তবে বৈধ লেনদেন বাড়লেও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় একটি অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। বিশেষ করে উচ্চ ব্যয়ের চিকিৎসার ক্ষেত্রে অনেকেই হুন্ডিসহ অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রেরণের পথ বেছে নিচ্ছেন।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এক অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চিকিৎসা খাতে ব্যয় হয়। তাঁর মতে, এই বিপুল অঙ্কের অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে ১৫ হাজার ডলারের বেশি অর্থ বিদেশে পাঠাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদন নিতে হয়। এই অনুমোদন প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ও জটিল হওয়ায় অনেক রোগী ও তাদের পরিবার অনানুষ্ঠানিক পথ বেছে নিতে বাধ্য হন।
তাদের পরামর্শ, নিবন্ধিত চিকিৎসকের সুপারিশ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নথির ভিত্তিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বেশি অঙ্কের অর্থ ছাড়ের ক্ষমতা দেওয়া হলে বৈধ চ্যানেলের ব্যবহার আরও বাড়বে। একই সঙ্গে হুন্ডিনির্ভরতাও কমে আসবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বৈধ পথে চিকিৎসা ব্যয়ের অর্থ প্রেরণ কমে ১৮ লাখ ডলারে নেমে এসেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ১ কোটি ডলারে পৌঁছায় এবং সর্বশেষ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিমাণ এখনো দেশের প্রকৃত বিদেশি চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় খুবই সীমিত। বিভিন্ন গবেষণা ও খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশিরা প্রতি বছর বিদেশে চিকিৎসা বাবদ ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেন। এর বড় অংশই এখনো অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে পরিশোধ হওয়ায় সরকারের রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় এর পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা ব্যয়ের অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করা গেলে বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে। একই সঙ্গে হুন্ডিনির্ভরতা কমে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হবে।