Monday, April 13, 2026

যুদ্ধের ভেতর তেহরানে এক তরুণীর জীবনসংগ্রাম ও আতঙ্কের দিনগুলো


ছবিঃ স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের মতে, মার্কিন–ইসরায়েলি হামলায় তেহরানে রাফি-নিয়া সিনাগগ ও আশপাশের আবাসিক ভবন ধ্বংস হওয়ার পর, ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল তেহরানে এক ইরানি বাসিন্দা তার ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন (সংগৃহীত । আল জাজিরা । AFP)

 আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

ইরানের রাজধানী তেহরানের পশ্চিমাঞ্চলের একটি অ্যাপার্টমেন্টে রুমমেট ফাতেমেহর সঙ্গে বসবাস করেন ২৭ বছর বয়সী এক নারী (নিরাপত্তার কারণে নাম পরিবর্তিত)। অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী এবং একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে রিস্ক কন্ট্রোল অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মরত এই তরুণী ২০২৫ সালের জুনের ইসরায়েল–ইরান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আগেই পেরিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তিনি শহর না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি জানান, যুদ্ধ শুরুর আগের রাত ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। ফোনে আসা প্রতিটি খবরই ছিল দোটানার মধ্যে আক্রমণ হবে কি হবে না। মাঝরাতে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় তিনি জেগে ছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত কিছু না ঘটায় তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। পরদিন সকালেই বাস্তবতা বদলে যায়।

২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে তেহরানে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে বলে জানান তিনি। ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় থাকা এই তরুণী তখনও বুঝে উঠতে পারেননি কী ঘটেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিবারের সদস্যরা ফোন করে শহর ছাড়ার অনুরোধ জানালেও তিনি তেহরানেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

এর আগে ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করেছিল। সেই সময় পরিবার তাকে জোর করে শহর থেকে সরিয়ে নিলেও এবার তিনি নিজ শহর ছাড়তে রাজি হননি। তবে পরিস্থিতি দ্রুতই ভয়াবহ রূপ নেয় বলে জানান তিনি।

দিনের বিভিন্ন সময়ে বোমা হামলার আশঙ্কায় জীবন এক ধরনের রুটিনে পরিণত হয়। কখনো ভোরে, কখনো বিকেলে আবার রাতের দিকে হামলার আশঙ্কা তৈরি হতো। বাইরে বের হওয়া সীমিত হয়ে পড়ে, প্রয়োজনীয় জিনিস অনলাইনে অর্ডার করে সংগ্রহ করতে হতো।

তিনি আরও জানান, ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় যোগাযোগ ও তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। ভিপিএন ব্যবহার করেও দীর্ঘ সময় অনলাইনে থাকা সম্ভব হয়নি। বই পড়া ও অফলাইন কনটেন্ট দেখেই সময় কাটাতে হয়েছে।

এক রাতে মেহরাবাদ বিমানবন্দরের কাছে ভয়াবহ বিস্ফোরণের সময় তারা বাসার নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সেই মুহূর্তকে তিনি জীবনের সবচেয়ে আতঙ্কের সময় হিসেবে বর্ণনা করেন।

যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব কর্মক্ষেত্রেও পড়ে। অফিসে একদিনেই ৪১ জনের মধ্যে ১৮ জন চাকরি হারান বলে জানা যায়। অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে কর্মপরিবেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। তবে মানসিকভাবে স্বস্তি ফিরতে সময় লাগে বলে জানান তিনি। যুদ্ধবিরতির পরদিনই তিনি সাধারণ জীবনে ফেরার চেষ্টা হিসেবে সেলুনে যাওয়া ও ব্যক্তিগত যত্নের কাজ শুরু করেন।

এই অভিজ্ঞতাকে তিনি “নিজ শহরের ভেতরেই শরণার্থীর মতো জীবন” বলে বর্ণনা করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন ব্যক্তিগত গল্পগুলো যুদ্ধের বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে, যেখানে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন