- ২৫ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। কুড়িগ্রাম
নিজের ছোট্ট একটি দোকান। সেখান থেকে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে সংসার। তবু অসহায় ও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের সেবায় কখনো পিছিয়ে যাননি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার রায়হানুর রহমান কাজল। কখনো তাদের গোসল করিয়ে দেন, কখনো হাত-পায়ের নখ কেটে দেন, আবার কখনো নিজের হাতে খাবার তুলে দেন। প্রয়োজন হলে কিনে দেন নতুন পোশাক। বিনিময়ে নেই কোনো প্রত্যাশা। মানুষের মুখে একটু স্বস্তির হাসি দেখেই তৃপ্তি খুঁজে পান তিনি।
এভাবেই প্রায় ২১ বছর ধরে নীরবে মানবসেবা করে যাচ্ছেন ৩৯ বছর বয়সী কাজল। সীমিত সামর্থ্য নিয়েও তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে ভালোবাসা ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
কাজল রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের বেটুবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা মৃত গমির উদ্দিন আহমেদ এবং মা শাহের বানু। নাজিমখান বাজারে তার একটি ছোট ভুসির দোকান রয়েছে। সেখানে ভুসি, মাছের খাদ্য ও ওষুধ বিক্রি করে সংসার চালান তিনি। এর মধ্য থেকেও প্রতি মাসে প্রায় তিন হাজার টাকা ব্যয় করেন অসহায় মানুষগুলোর সেবায়।
কাজলের মানবিক পথচলার শুরু ২০০৫ সালে। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে নাজিমখান বাজারে আসা-যাওয়ার সময় তিনি প্রায়ই দেখতেন, মানসিক ভারসাম্যহীন অনেক মানুষ অপরিচ্ছন্ন পোশাকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কারও হাত-পায়ের নখ বড় হয়ে গেছে, কারও চুল-দাড়ি এলোমেলো। অনেকের খাবার কিংবা পরিচ্ছন্নতারও ঠিকঠাক ব্যবস্থা নেই।
এসব দৃশ্য কষ্ট দিত তাকে। মনে প্রশ্ন জাগত, যাদের নিজেদের যত্ন নেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ কি নেই? সেই ভাবনা থেকেই ধীরে ধীরে তাদের সেবা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরে ২০১১ সালে নাজিমখান বাজারে নিজের দোকান দেওয়ার পর এ কাজ আরও নিয়মিতভাবে শুরু করেন।
এরপর থেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের গোসল করানো, নখ কেটে দেওয়া, চুল-দাড়ি ছেঁটে দেওয়া, খাবার খাওয়ানো এবং নতুন পোশাক কিনে দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছেন কাজল। তার ভাষ্য, এ পর্যন্ত প্রায় ১২০ জনকে বিভিন্নভাবে সেবা দিয়েছেন। বর্তমানে নিয়মিত চারজনের দেখাশোনা করছেন তিনি।
কাজলের এই দীর্ঘ মানবিক যাত্রায় সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার স্ত্রী মারুফা আক্তার লিপি। স্বামীর উদ্যোগে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে বাড়িতে নিয়ে আসা অসহায় মানুষগুলোর খাবারের ব্যবস্থাও করেন তিনি।
মারুফা আক্তার লিপি বলেন, ‘আমার স্বামীকে আমি সব সময় অনুপ্রাণিত করি। মাঝেমধ্যে তিনি অনেককে বাড়িতে নিয়ে আসেন। আমি তাদের খাবার খাওয়াই। তার এ কাজকে আমি ভালো চোখে দেখি।’
সংসারের সীমিত আয়ের মধ্যেও দুজনের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা যেন মানবিকতার এক ছোট্ট আশ্রয় হয়ে উঠেছে। যেখানে অবহেলার বদলে মেলে যত্ন, আর দূরত্বের বদলে তৈরি হয় আপনজনের সম্পর্ক।
কাজলের মানবিকতার সবচেয়ে আবেগঘন উদাহরণ রাসেল। বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধী এই তরুণকে প্রায় ১০ বছর ধরে নিজের কাছে আশ্রয় দিয়ে রেখেছেন তিনি। রাসেলের খাবার, পোশাক ও দৈনন্দিন দেখাশোনার দায়িত্বও পালন করছেন নিজের অর্থে।
রাসেল নিজে ঠিকভাবে পোশাক পরতে পারেন না। তাই তাকে কাপড় পরানো থেকে শুরু করে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় কাজে সহযোগিতা করেন কাজল। শুধু থাকা-খাওয়া ও পরিচর্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি; রাসেলকে স্কুলেও ভর্তি করিয়েছেন। কোথাও দাওয়াতে গেলে তাকেও সঙ্গে নিয়ে যান। নিজের সন্তানের মতোই আগলে রাখেন তাকে।
কাজলের এই আন্তরিকতা স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদেরও নজর কেড়েছে। নাজিমখান বাজারের পাশের একটি দর্জির দোকানের মালিক মো. এমদাদুল হক (৫৫) বলেন, ‘যেকোনো এলাকার মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ নাজিমখান বাজারে এলে কাজল তাদের খোঁজ করেন। রাসেল তো সব সময় তার সঙ্গে থাকে। রাসেল নিজে কাপড়ও পরতে পারে না। সবকিছু কাজল করে দেন। নিজের সন্তানের মতো তাকে আগলে রাখেন।’
রামকৃষ্ণ গ্রামের বাসিন্দা মো. রেজা বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি কাজলকে এভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখছেন। তার ভাষায়, বাজারে এমন মানুষ এলেই কাজল তাদের কাছে নিয়ে যান, হাত-পায়ের নখ কেটে দেন, গোসল করান এবং খাবার খাইয়ে বিদায় করেন।
নাজিমখান ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুর সবুর মন্ডল (৬০) বলেন, ‘আমরা তো ভালো মানুষ পবিত্র-পরিচ্ছন্ন থাকতে পারি। কিন্তু মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষরা অনেক সময় এসব বুঝতে পারেন না। কাজল তাদের পরিচ্ছন্ন থাকতে সাহায্য করছেন। এটি আমার কাছে প্রশংসনীয় কাজ।’
নাজিমখান ছালামিয়া নূরানী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রশিদও কাজলের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কাজলকে মানবসেবায় নিয়োজিত থাকতে দেখছেন তিনি। সমাজের অনেকেই এসব মানুষকে এড়িয়ে চলেন, অথচ কাজল তাদের আপন করে নিয়েছেন।
কেন এত বছর ধরে নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে এই দায়িত্ব পালন করছেন—এমন প্রশ্নে কাজল বলেন, ‘আমি এদের আপন মানুষ মনে করি। ওদের আসলে বুদ্ধি কম। আমি আমার মন থেকে এ কাজগুলো করি। তাদের সেবা করলে আমি মনের তৃপ্তি পাই। আমি যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন এই কাজ করব।’
কাজলের এই উদ্যোগকে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোছা. ববিতা খাতুন। তিনি বলেন, সমাজে মানসিক ভারসাম্যহীন ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সেবা করা অত্যন্ত মহৎ কাজ। যখন অনেকেই তাদের এড়িয়ে চলেন বা অবহেলা করেন, তখন যারা মমতা দিয়ে তাদের আগলে রাখেন, তারা সমাজের প্রকৃত বন্ধু।
বড় কোনো সংগঠন কিংবা আর্থিক সামর্থ্যের জোর নয় নিজের বিবেক, মমতা আর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই যে মানবসেবার সবচেয়ে বড় শক্তি, রায়হানুর রহমান কাজলের জীবন তারই উদাহরণ। নিজের ছোট্ট দোকান আর সীমিত আয় নিয়ে তিনি হয়তো বদলে দিতে পারবেন না পুরো সমাজকে। কিন্তু যাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের জীবনে তিনি হয়ে উঠেছেন নির্ভরতার এক পরিচিত মুখ।