- ২৫ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আলোচিত মাদক কারবারি জুয়েল রানা ও তার স্ত্রী সালমা জাহানের নামে থাকা ২৪টি ব্যাংক হিসাবে গত কয়েক বছরে ১৪ কোটি ২৪ লাখ টাকার বেশি লেনদেনের তথ্য পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। একই সঙ্গে তাদের নামে বিপুল পরিমাণ জমি ও বাড়ির সন্ধান মিলেছে। এসব সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব জব্দের অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।
জুয়েল রানা (৩৪) বর্তমানে একটি মাদক মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অর্থ বৈধ করার অভিযোগে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত করছেন রাজশাহী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জুয়েল ও তার স্ত্রীর নামে থাকা সম্পদের সঙ্গে মাদক কারবারের অর্থের যোগসূত্র রয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আদালত সম্পদ জব্দের আবেদন মঞ্জুর করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তি জব্দের আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া যাবে। তদন্ত শেষে জুয়েল রানা ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মামলার এজাহার ও প্রাথমিক অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ব্যাংকের শাখায় জুয়েল রানার নামে ১২টি ব্যাংক হিসাবের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চারটি চলতি হিসাব, তিনটি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব এবং পাঁচটি সঞ্চয়ী হিসাব। এসব হিসাবে গত নয় বছরে মোট ৬ কোটি ১৮ লাখ ৩ হাজার ৩১৭ টাকা লেনদেন হয়েছে।
জুয়েলের নামে দুটি বাড়িসহ ছয়টি জমির তথ্যও পেয়েছে ডিএনসি। এসব সম্পত্তির দলিলমূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ টাকা। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, বর্তমান বাজারমূল্যে এসব সম্পদের মূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে।
এ ছাড়া রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে একটি পেট্রলপাম্প এবং ঢাকায় আরও দুটি বাড়ি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও আর্থিক উৎস যাচাইয়ের বিষয়টি তদন্তের অংশ।
জুয়েলের স্ত্রী সালমা জাহানের (৩০) নামেও দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে ১২টি হিসাবের সন্ধান পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এসব হিসাবে গত আট বছরে ৬ কোটি ৮৬ লাখ ১২ হাজার ৯৭০ টাকা লেনদেন হয়েছে।
সালমার নামে পাঁচটি জমির তথ্যও পাওয়া গেছে, যেগুলোর দলিলমূল্য ২২ লাখ ৬ হাজার টাকা। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, স্বামীর মাদক কারবার থেকে অর্জিত অর্থ এসব ব্যাংক হিসাবে লেনদেন এবং জমি কেনার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি নিজের কারবারের অর্থ লেনদেনের জন্য স্ত্রীর নামে ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করেছেন জুয়েল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জুয়েলের নামে একটি আয়কর ফাইল থাকলেও বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বৈধ আয়ের উৎস প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। এসব অর্থের উৎস ও সম্পদ অর্জনের প্রক্রিয়া যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, জুয়েল রানা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়া মালবাগডাঙ্গা গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে। ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে তার পরিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার বেলেপুকুর এলাকায় বসবাস করে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কৈশোর থেকেই হেরোইন চোরাচালানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন জুয়েল। শুরুতে সীমান্ত এলাকা থেকে অর্থের বিনিময়ে মাদক বহন করলেও পরে নিজেই কারবার গড়ে তোলেন। ভারত থেকে সীমান্তপথে হেরোইন এনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাইকারি সরবরাহের একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
জুয়েলের নামে দেশের বিভিন্ন থানায় মোট নয়টি মাদক মামলার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায়, দুটি ঢাকায় মিরপুর ও পল্টন থানায় এবং দুটি নাটোর সদর থানায় দায়ের করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর বেলেপুকুর ও বালুবাগান এলাকার বাড়ি থেকে ৯৫০ গ্রাম হেরোইন ও ইয়াবাসহ জুয়েলকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি দল। গ্রেপ্তারের ২৮ দিনের মাথায় তিনি আদালত থেকে জামিন পান।
সে সময় কারাগার থেকে মুক্তির পর তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা এবং মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে নিজ এলাকায় ফেরার ঘটনা আলোচনায় আসে। এ নিয়ে ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর দৈনিক যুগান্তরে ‘২৮ দিনে জামিন পেয়ে বোমা ফাটিয়ে উল্লাস’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
এলাকাবাসীর একাংশের অভিযোগ, কারাগারে থাকলেও জুয়েলের মাদক কারবারের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; পরিবারের সদস্যরা সেটি পরিচালনা করছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত একটি মাদক মামলায় জুয়েল রানাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেন। সাজা ঘোষণার পর তিনি পলাতক ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এজাহার ও তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে তিনি সৌদি আরবে ওমরাহ পালন করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেন বলে দাবি করা হয়েছে। পরে ২২ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর লক্ষ্মীপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানা পুলিশ।
বর্তমানে জুয়েল রানা উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক তদবির চালানোরও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মাদক কারবারের অর্থ দিয়ে সম্পদ অর্জন ও অর্থের উৎস আড়াল করার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত চলছে। ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তির নথি যাচাইয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের কথা জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।