- ০২ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়ে এবার প্রকাশ্যেই অসন্তোষের কথা জানাল ভারত। ওয়াশিংটনের বাণিজ্যনীতি, পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে জয়শঙ্কর বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে একতরফাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখনো ভালো অবস্থানে থাকলেও সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক মতপার্থক্য সাধারণত পর্দার আড়ালেই সামলাত নয়াদিল্লি। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে একাধিক বিষয়ে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ায় ভারতের বক্তব্যেও এখন আগের তুলনায় বেশি কঠোরতা দেখা যাচ্ছে।
চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক গবেষক চিয়েটিগজ বাজপেয়ি মনে করেন, জয়শঙ্করের বক্তব্য ভারত-মার্কিন সম্পর্কের বর্তমান অবস্থার একটি খোলামেলা মূল্যায়ন। তার ভাষ্য, দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসনের শুরুতে ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী থাকলেও এখন সেই আশাবাদ অনেকটাই কমেছে।
দুই দেশের সম্পর্কের বড় অস্বস্তির জায়গাগুলোর একটি বাণিজ্য। ২০২৫ সালে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এতে ভারতের পক্ষে প্রায় ৫৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল।
জয়শঙ্কর বলেন, কোনো দেশ শুধু নিজের স্বার্থ বিবেচনা করে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, যার প্রভাব অন্য দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ে। তিনি ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া চাপের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলছে। তবে এখনো চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি দুই দেশ। কৃষি খাত, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং শুল্ক নিয়ে আলোচনায় বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। ভারতীয় পক্ষের বক্তব্য, দেশটির কৃষি ও উৎপাদনব্যবস্থার বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে দ্রুত বাজার উন্মুক্ত করার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
এদিকে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি নিয়েও ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছে। রুশ তেল কেনা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ রেখে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন আইন করা হয়েছে। ভারত ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, এ ধরনের শুল্ক দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের সাবেক কূটনীতিক অজয় বিসারিয়ার মতে, নতুন শুল্ক কার্যকর হলে দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে। তার ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও দেশে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বাণিজ্যের পাশাপাশি পাকিস্তান ইস্যুও নয়াদিল্লি-ওয়াশিংটন সম্পর্কে বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।
গত বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সামরিক সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয় বলে দাবি করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ভারত অবশ্য কাশ্মীরসহ দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
এরপরও ট্রাম্প একাধিকবার ওই যুদ্ধবিরতিতে নিজের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের প্রশংসা এবং তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়ার ঘটনাও নয়াদিল্লির দৃষ্টি এড়ায়নি।
জয়শঙ্কর বলেন, সন্ত্রাসবাদ ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তার অভিযোগ, প্রতিবেশী দেশ থেকে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবাদের যে হুমকির কথা ভারত বলে আসছে, সেটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মাত্রার উপলব্ধি বা সহানুভূতি পাওয়া যাচ্ছে না।
অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পান্তের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের পাকিস্তানকেন্দ্রিক নীতিতে ভারতের সংবেদনশীল বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব না পাওয়ায় নয়াদিল্লি এখন নিজেদের অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তিত সুরের পেছনে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন কয়েকজন বিশ্লেষক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে বারবার নতি স্বীকার করছেন এমন অভিযোগ ভারতের বিরোধী দলগুলো বিভিন্ন সময়ে তুলেছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি ভিসা নীতিতে পরিবর্তন, অভিবাসন নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এবং ভারতীয় পেশাজীবীদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জয়শঙ্কর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মানুষের চলাচলকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হলেও এখন অভিবাসননীতি ও অভিবাসন-রাজনীতির মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব জনমতেও পড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন মোদি। বৈঠকটিকে তিনি ‘ফলপ্রসূ’ বলে উল্লেখ করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রাম্পকে তার ‘ভালো বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করার তুলনায় এবারের ভাষা ছিল অপেক্ষাকৃত আনুষ্ঠানিক। দুই নেতার আলোচনায় বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার বিষয় উঠে এসেছে।
তবে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েনকে স্থায়ী বিচ্ছেদ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। চ্যাথাম হাউসের বাজপেয়ির মতে, দুই দেশই সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের পথ খোলা রাখতে চাইছে। তার মতে, বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হওয়া দুই দেশের সম্পর্কের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কীভাবে মতপার্থক্য সামলে কৌশলগত সহযোগিতা অব্যাহত রাখা যায়। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের নীতির পরিবর্তন ও বাণিজ্যিক চাপের মধ্যেও নয়াদিল্লি নিজের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থকে কতটা দৃশ্যমানভাবে সামনে রাখে, সেটিও আগামী দিনের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠছে।