Tuesday, November 3, 2026

অনাহারে কাটছে দিন; ন্যূনতম চাহিদা পূরণেও অপ্রতুল পোশাকশ্রমিকদের মজুরি: আল জাজিরার প্রতিবেদন


ছবিঃ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে সাভারে একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা সেলাই মেশিন চালাচ্ছেন (সংগৃহীত । আল জাজিরা /মোহাম্মদ পনির হোসেন/রয়টার্স)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে কাজ করেও পরিবারের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দিতে পারছেন না অনেক শ্রমিক। বাড়িভাড়া, খাবার, জ্বালানি ও সন্তানদের শিক্ষার খরচ মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। এমনকি অভাবের কারণে সন্তানদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন কেউ কেউ। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও আয় না বাড়ায় তৈরি পোশাকশ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা আন্দোলনে নেমেছেন শ্রমিকরা।

রাজধানী ঢাকার কাছাকাছি একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন ৩৭ বছর বয়সী লাইলী বেগম। ভার্চুয়াল বটমস লিমিটেডের অভিজ্ঞ সেলাই অপারেটর হিসেবে তাঁর মাসিক বেতন প্রায় ১৫ হাজার টাকা। অতিরিক্ত সময় কাজ করলে কখনো কখনো আয় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় পৌঁছায়। কিন্তু এই আয় দিয়েও সংসারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না তিনি।

অর্থাভাবে চলতি বছরের শুরুতে তাঁর ১৫ বছর বয়সী মেয়ে ও ১২ বছর বয়সী ছেলেকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিতে হয়েছে। প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাও এখন তাঁর পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কোনো দিন একবেলা ভালো খাবার জোটে, কোনো দিন সেটুকুও মেলে না।

আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লাইলী বেগম জানান, সকালে মুড়ি ও চানাচুর খেয়েছেন। দুপুরে খাবারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। রাতে ভালো কিছু খেতে পারবেন—এই আশায় না খেয়েই দিন পার করেছেন পরিবারের সদস্যরা। তাঁর ভাষায়, ছেলের শরীর এতটাই শুকিয়ে গেছে যে বুকের পাঁজরের হাড় পর্যন্ত গোনা যায়। অসহায় অবস্থায় সন্তানদের জন্য কিছু করতে না পারার কষ্ট তাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়।

লাইলী বেগমের মতো এমন সংকটে রয়েছেন দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। তাঁদের প্রায় অর্ধেকই নারী। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাঁদের মজুরির ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।

বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীনের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এই শিল্পের ওপর নির্ভর করে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি। গত অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে এই খাতের বড় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে এইচঅ্যান্ডএম, জারা, লেভি স্ট্রস, ওয়ালমার্ট ও প্রাইমার্কের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য পোশাক তৈরি করা শ্রমিকদের অনেকেই নিজেদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না।

শ্রমিকদের অভিযোগ, প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের মজুরি অনেক কম। বর্তমানে কম্বোডিয়ায় পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ২১০ ডলার। ভিয়েতনামে তা ১৪০ থেকে ২১০ ডলারের মধ্যে। অন্যদিকে চীনের গুয়াংডং শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের মাসিক মজুরি ২৮৬ থেকে ৩৭৮ ডলার পর্যন্ত।

এই বৈষম্যের পাশাপাশি দেশে মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শনিবার থেকে আন্দোলনে নামেন তাঁরা।

রোববার ঢাকার আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের জামগড়া এলাকায় শ্রমিকদের একটি বিক্ষোভে অংশ নেন লাইলী বেগম। এ সময় আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। কয়েকজন শ্রমিককে আটকও করা হয়।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, রোববারের বিক্ষোভের কারণে ৫২৯টি কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিকের কাজ প্রভাবিত হয়।

সোমবারও টানা তৃতীয় দিনের মতো রাজপথে নামেন শ্রমিকরা। গাজীপুর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন তাঁরা। এ সময় কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পাশের মিরপুর এলাকাতেও পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।

লাইলী বেগমের অভিযোগ, সরকার মজুরি বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও কবে থেকে এবং কত টাকা বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে শ্রমিকদের দুর্দশা দূর করা সম্ভব নয়।

শুধু লাইলী বেগম নন, সংসার চালাতে গিয়ে ঋণের বোঝা বাড়ছে অনেক শ্রমিকের। আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করা ৩০ বছর বয়সী রাসেল খান জানান, অতিরিক্ত সময় কাজসহ তাঁর মাসিক আয় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। এই অর্থ দিয়ে মা, ছোট ভাই, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ টাকা ঋণ করতে হয়েছে তাঁকে।

তাঁর মতে, বর্তমান আয়ে পরিবারের ভরণপোষণ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আয় বাড়ছে না, অথচ প্রতিদিনই বাড়ছে বাজার খরচ।

২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সর্বশেষ তৈরি পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর থেকে পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে দেশে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।

লাইলী বেগমের মাসিক আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় বাসাভাড়ায়। মা ও দুই সন্তানকে নিয়ে একটি কক্ষের জন্য তাঁকে দিতে হয় ৩ হাজার ৫০০ টাকা। সিরাজগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে থাকা বাবার খরচও তাঁকেই বহন করতে হয়। অর্থের অভাবে প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা দামের গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে না পেরে পরিত্যক্ত কাগজ ও অন্যান্য জ্বালানি পুড়িয়ে রান্না করতে হচ্ছে তাঁকে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, গত পাঁচ বছরের ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতি নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মানও নেমে যাচ্ছে। তাঁদের হাতে বাড়তি কোনো অর্থ থাকছে না।

শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে রোববার ছয় সদস্যের একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেয় সরকার। এর আগে শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। বর্তমান তিন বছরের সময়সীমা আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা।

আন্দোলন শুরুর পর রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাক কারখানার মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে আলোচনার মাধ্যমে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের আশ্বাস দেওয়া হয়।

শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানান, মজুরি বোর্ড শিগগিরই তাদের কার্যক্রম শুরু করবে।

অন্যদিকে বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার নতুন মজুরি ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসের বেতন থেকে কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আন্দোলনরত শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়ে আটক শ্রমিকদের মুক্তি এবং তাঁদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি নিয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো নিয়ে ভারসাম্য রক্ষা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজিএমইএর কর্মকর্তা ও কিউট ড্রেস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ হোসেন মুহাম্মদ মোস্তাফিজ বলেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার উপযোগী মজুরি পাওয়া প্রয়োজন। তবে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ন্যায্য মূল্য না দিলে কারখানাগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে, যা কর্মসংস্থানের জন্যও ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।

তাঁর মতে, শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার দায়িত্ব শুধু কারখানার মালিকদের নয়; আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকেও ন্যায্য মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে দায়িত্ব নিতে হবে।

অন্যদিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ল্যারেন্ডন স্কলার ও মানবাধিকার আইনজীবী তাকবির হুদা আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, বাংলাদেশের শ্রমিকদের উৎপাদিত পোশাক থেকে তৈরি হওয়া মূল্যের বড় অংশ আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে গেলেও শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যায্য মজুরির বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না।

তাঁর মতে, শ্রমিকদের আন্দোলনের পরই মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু বোর্ড গঠন করলেই শ্রমিকদের দাবি পূরণ হবে না; মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টিও মজুরি নির্ধারণে গুরুত্ব দিতে হবে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখে। একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও জীবনযাত্রার নিশ্চয়তার দাবি, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ। তবে এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠছেন সেই শ্রমিকরা, যাঁদের শ্রমে সচল রয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত।

লাইলী বেগমের মতো লাখো শ্রমিকের কাছে মজুরি বৃদ্ধির আলোচনা কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি পরিবারের খাবার, সন্তানদের শিক্ষা এবং একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার প্রশ্ন। তাঁর প্রত্যাশা, শুধু বেতন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। কারণ আয় না বাড়লে এবং বাজারদর না কমলে প্রতিদিনের এই সংগ্রাম থেকে মুক্তি পাওয়া তাঁদের জন্য কঠিনই থেকে যাবে।

তথ্যসুত্রঃ আল জাজিরা 

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন