- ০৩ নভেম্বর, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদনঃ মোঃ ইয়াসির আজিজ
খুলনা নগরী ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্রমেই বাড়ছে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও আতঙ্ক। দিনের আলো কিংবা রাতের অন্ধকার কোনো সময়ই যেন থামছে না হত্যার ঘটনা। কোথাও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, কোথাও আবার নদীর চরে মিলছে গুলিবিদ্ধ মরদেহ। সর্বশেষ মাত্র ৩৬ ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনা মহানগরী ও রূপসা উপজেলায় চারটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ধারাবাহিক এসব ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতা। বিশেষ করে জনবসতিপূর্ণ এলাকা, সড়ক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কতটা কার্যকর, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
সর্বশেষ সোমবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের সিংহেরচর এলাকায় জেলখানা ঘাটসংলগ্ন আলম মেম্বারের ঘাট থেকে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁদের মাথায় গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। নিহতদের একজন মেহেদী হাসান সোহাগ (৩৫)। তিনি রূপসার রাজাপুর এলাকার আব্দুল্লাহর ছেলে। পেশায় জেলখানা ঘাটের মাঝি ছিলেন। অপরজনের নাম রেজাউল করিম (৩০) বলে জানা গেলেও তাঁর বিস্তারিত পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানা যায়, সোমবার বেলা ১১টার দিকে নদীর কাদার মধ্যে প্রথমে একটি মরদেহ দেখতে পান তাঁরা। পরে ভাটার সময় পানি কমে গেলে একই স্থানে আরও একটি মরদেহ চোখে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে। স্থানীয়দের দাবি, মরদেহগুলো থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। তাঁদের ধারণা, হত্যার পর কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে।
রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, জোয়ারের পানিতে মরদেহ দুটি ভেসে এসেছে। একজনের পরিচয় মেহেদী হাসান সোহাগ হিসেবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অপরজনের পরিচয় শনাক্তে কাজ করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত দুজনই অপরাধী চক্র ‘বি কোম্পানি’র সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানান, দুজনকেই মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের আশপাশে বেশ কয়েকটি জাহাজ নোঙর করা থাকায় সেখানে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। দুর্বৃত্তরা অন্য কোথাও তাঁদের হত্যা করে নদীতে ফেলে থাকতে পারে। পরে জোয়ারের পানিতে মরদেহ দুটি ঘাটে ভেসে আসে। হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে নৌ-পুলিশ ও জেলা পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
এর আগে রোববার (২ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নগরীর আড়ংঘাটা থানার রায়েরমহল এলাকায় নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার শিকার হয়ে নিহত হন জেলা তাঁতীদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ হুমায়ুন কবির। অভিযোগ রয়েছে, দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘আল-ক্যান্টিনো’ রেস্টুরেন্টে ঢুকে হামলা চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নিহতের ছেলে সৈয়দ নুর আমিন সৌহার্দ্য বাদী হয়ে ছাত্রদল নেতা আরাফাতসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরও দুই থেকে তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে এজাহারভুক্ত শেখ সিদ্দিক (৫৩) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আড়ংঘাটা থানার ওসি হালিমুর রহমান জানিয়েছেন, বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, শনিবার (১ নভেম্বর) রাতে নগরীর লবণচরা থানাধীন কাশেমিয়া জামে মসজিদের কাছ থেকে শহীদুল ইসলাম কলিন (৩৫) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর বাবা মাহতাব বাদী হয়ে চারজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।
লবণচরা থানার ওসি (তদন্ত) শহিদুল ইসলাম জানান, তদন্তের স্বার্থে আসামিদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে থানা-পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত কলিনের বিরুদ্ধে মাদক ও হত্যা-সংক্রান্ত মোট আটটি মামলা ছিল। এর মধ্যে সাতটি মাদক এবং একটি হত্যা মামলা।
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর কারণ সম্পর্কে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া জানান, মহানগরীর দুটি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে একটি ফ্রিজের কিস্তির বকেয়া টাকা নিয়ে বিরোধ এবং অন্যটি মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দৌলতপুর ও আড়ংঘাটা এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদক কারবার, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এ ধরনের সহিংসতার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে না পারলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়তে পারে।
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতার মধ্যেই আগামী বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) খুলনা সফরে আসার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। ওই দিন খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২০২৭ (সিজন-২)’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে তাঁর যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সামনে রেখে নগরী ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, অনুষ্ঠানস্থল ও আশপাশের এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
কেএমপি ও জেলা পুলিশ জানিয়েছে, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে টহল এবং নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সন্দেহভাজন অপরাধীদের শনাক্ত ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নগরবাসীর দৈনন্দিন নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সফর উপলক্ষে নয়, বরং সারা বছরই অপরাধ দমনে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে প্রশাসন। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে খুলনায় স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে।