Monday, January 19, 2026

ইউরোপে ২০৩৫ সালের গ্যাসচালিত গাড়ি নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রস্তাব, ইভি খাতে বিতর্ক


প্রতীকী ছবি: (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

বিদ্যুৎচালিত গাড়ির দিকে যাওয়ার লক্ষ্য থেকে ইউরোপ সরে যাচ্ছে না, তবে সেই যাত্রার সময়সূচি কিছুটা শিথিল হতে পারে। ইউরোপীয় কমিশন ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্যাস ও ডিজেলচালিত নতুন গাড়ি বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার যে পরিকল্পনা নিয়েছিল, তা আংশিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিল্পখাতকে ‘আরও নমনীয়তা’ দেওয়ার যুক্তিতে এই সিদ্ধান্ত সামনে আনা হয়েছে।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের পরেও নতুন গাড়ি বিক্রির সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হাইব্রিড বা অন্যান্য স্বল্প নিঃসরণযুক্ত যানবাহন হতে পারবে। তবে শর্ত হিসেবে নির্মাতাদের কার্বন নিঃসরণ পুষিয়ে নিতে কার্বন অফসেট কিনতে হবে। এই পরিবর্তন ইউরোপীয় কমিশনের ঘোষিত বৃহত্তর ‘অটোমোটিভ প্যাকেজ’-এর অংশ, যার লক্ষ্য ইউরোপের গাড়ি শিল্পকে একসঙ্গে পরিবেশবান্ধব ও প্রতিযোগিতামূলক রাখা।

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট যদি প্রস্তাবটি অনুমোদন করে, তাহলে ঐতিহ্যবাহী ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারা স্বস্তি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই তারা পুরোপুরি বৈদ্যুতিক গাড়িতে যেতে আরও সময় চাইছিল। বিশেষ করে টেসলা এবং চীনের সস্তা বৈদ্যুতিক গাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তারা চাপে রয়েছে। তবে এই নীতিগত পরিবর্তন ইভি স্টার্টআপ ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

ইউরোপভিত্তিক জলবায়ু বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ফান্ডের অংশীদার ক্রেইগ ডগলাস বলেন, চীন ইতিমধ্যেই বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে আধিপত্য তৈরি করেছে। ইউরোপ যদি স্পষ্ট ও উচ্চাভিলাষী নীতিগত বার্তা না দেয়, তাহলে ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে নেতৃত্ব হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

ডগলাস ছিলেন ‘টেক চার্জ ইউরোপ’ নামে একটি খোলা চিঠির অন্যতম স্বাক্ষরকারী। গত সেপ্টেম্বরে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েনের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে ক্যাবিফাই, ইডিএফ, আইনরাইড, ইবেরড্রোলা এবং বহু ইভি-সংক্রান্ত স্টার্টআপের শীর্ষ কর্মকর্তারা ২০৩৫ সালের শূন্য-নিঃসরণ লক্ষ্যে অটল থাকার আহ্বান জানান।

তবে ইউরোপীয় অটোমোবাইল শিল্পের চাপ শেষ পর্যন্ত বড় প্রভাব ফেলেছে। এই খাতটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে নীতিনির্ধারকদের ওপর অর্থনৈতিক বাস্তবতা বড় ভূমিকা রাখছে।

অটোমোবাইল শিল্পের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। সুইডেনের গাড়ি নির্মাতা ভলভো সতর্ক করে বলেছে, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য থেকে সরে এসে স্বল্পমেয়াদি সুবিধা নেওয়া হলে ইউরোপের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভলভোর মতে, নিষেধাজ্ঞা পিছিয়ে দেওয়ার বদলে চার্জিং অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়ানোই বেশি কার্যকর হতো।

বার্লিনভিত্তিক ইভি চার্জিং স্টার্টআপ কারিকুয়ার প্রধান নির্বাহী ইসাম তিজানি বলেন, ২০৩৫ সালের বাধ্যবাধকতা দুর্বল হলে বিদ্যুতায়নের গতি কমে যাবে। তাঁর মতে, অতীতে এমন নমনীয়তা শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে বিলম্বই তৈরি করেছে।

তবে কমিশন অবকাঠামো ও সরবরাহ শৃঙ্খলের বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষা করেনি। ‘অটোমোটিভ প্যাকেজ’-এর অংশ হিসেবে ‘ব্যাটারি বুস্টার’ নামে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার আওতায় ইউরোপে নিজস্ব ব্যাটারি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। ফ্রান্সের ব্যাটারি নির্মাতা স্টার্টআপ ভারকোর এই উদ্যোগকে ইউরোপের ব্যাটারি শিল্প বিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে।

তবে সমালোচকদের একাংশের প্রশ্ন, ব্যাটারি বুস্টার কি সত্যিই ২০৩৫ সালের লক্ষ্য শিথিল করার নেতিবাচক বার্তা পুষিয়ে দিতে পারবে? ইতিমধ্যে ঐতিহ্যবাহী গাড়ি নির্মাতারা অভিযোগ তুলেছে, কার্বন অফসেটের শর্ত গাড়ির দাম বাড়াতে পারে, যা ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

এ ছাড়া যুক্তরাজ্য এই বিষয়ে কোন পথে হাঁটবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো যুক্তরাজ্য এখনো চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শুল্ক আরোপ করেনি, যদিও দেশটির বাজারে এসব গাড়ির দ্রুত বিস্তার স্থানীয় নির্মাতাদের উদ্বিগ্ন করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক মূলত জলবায়ু লক্ষ্য ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যকার টানাপোড়েনকেই সামনে আনছে। ইউরোপ যে সিদ্ধান্তই নিক, তা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করে দেবে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন