- ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
২০০৭ সালে দার্জিলিং পাহাড়ে যে উচ্ছ্বাসের ঢেউ উঠেছিল, তা শুধু একটি রিয়েলিটি শোর সাফল্যকে ঘিরে নয়—তা ছিল গোটা গোর্খা সমাজের আত্মপরিচয়ের উৎসব। সেই আবেগের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল থেকে জাতীয় তারকায় পরিণত হওয়া প্রশান্ত তামাং। তবে সেই গর্বের গল্পে এবার যুক্ত হলো বেদনার শেষ অধ্যায়। ইন্ডিয়ান আইডলের তৃতীয় আসরের বিজয়ী গায়ক ও অভিনেতা প্রশান্ত তামাং আর নেই।
গত রোববার নয়াদিল্লিতে নিজ বাসভবনে তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৪৩ বছর। ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত জটিলতায় তিনি মারা যান। স্ত্রী গীতা থাপা তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি মা, দুই বোন ও স্ত্রীকে রেখে গেছেন।
প্রশান্ত তামাংয়ের উত্থান ছিল এক অনন্য গল্প। পাহাড়ি শহর তুংসুংয়ে বেড়ে ওঠা এই যুবক ছোট বয়সেই বাবাকে হারিয়ে পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হন। জীবিকার তাগিদে যোগ দেন কলকাতা পুলিশের ব্যান্ডে, যেখানে তাঁর গানের প্রতিভা ধীরে ধীরে পরিচিতি পেতে থাকে। ২০০৭ সালে ইন্ডিয়ান আইডলে অংশ নিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো দার্জিলিংকে ভারতের জাতীয় বিনোদনমঞ্চে তুলে ধরেন।
ফাইনালে বিচারকদের নানা সমালোচনা সত্ত্বেও দর্শকের ভোটে বিজয়ী হন প্রশান্ত। সেই জয় গোর্খা সমাজের কাছে হয়ে ওঠে সম্মান ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। পাহাড়জুড়ে চলে উৎসব, সমাবেশ ও প্রচারণা। ইন্ডিয়ান আইডল জয়ের পর প্রকাশিত হয় তাঁর অ্যালবাম ‘ধন্যবাদ’। পাশাপাশি ‘বীর গোর্খালি’ গানটি পাহাড়ি মানুষের আবেগের প্রতীক হিসেবে জায়গা করে নেয়।
সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও নিজের অবস্থান তৈরি করেন প্রশান্ত তামাং। ২০১০ সালে নেপালি চলচ্চিত্র ‘গোর্খা পল্টন’-এর মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর একাধিক নেপালি সিনেমায় অভিনয় করেন। টেলিভিশন ও ওয়েব সিরিজেও তাঁকে দেখা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘পাতাললোক’-এর দ্বিতীয় মৌসুমে অভিনয়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।
প্রশান্ত তামাংয়ের নাম রাজনৈতিক ইতিহাসেও এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে। গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন পাহাড়ের মানুষের নীরব অনুপ্রেরণা। আন্দোলনের সময় পাশে থাকার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সংগ্রাম নিয়ে গান লেখার আগ্রহের কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি প্রশান্ত তামাংয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
একজন সাধারণ পাহাড়ি ছেলের জাতীয় তারকায় পরিণত হওয়ার এই গল্প আজ থেমে গেলেও, প্রশান্ত তামাং গোর্খা সমাজের কাছে থেকে যাবেন আশা, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে।