- ২৩ মে, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক আবারও কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে, যেখানে দুই দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে সংলাপ পুনরায় শুরু করার পক্ষে ও বিপক্ষে ভিন্ন ভিন্ন মতামত দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অঙ্গনে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির মন্তব্য এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির আদর্শিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা বন্ধ রাখা উচিত নয় এবং দুই দেশের মধ্যে সংলাপের দরজা খোলা রাখা প্রয়োজন। তার এই মন্তব্য ভারতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে যে “সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না”, বিশেষ করে পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসবাদের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত রাখা হয়েছে। তবে আরএসএস নেতার বক্তব্য সেই সরকারি অবস্থানের সঙ্গে ভিন্নতা তৈরি করেছে।
এদিকে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ নরভানে আরএসএস নেতার মতকে সমর্থন করে বলেছেন, সাধারণ মানুষের সম্পর্ক রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে ভারতীয় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তান এই ধরনের বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ইসলামাবাদ আশা করছে, আলোচনার পক্ষে আরও ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা না থাকলেও গত এক বছরে বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক (Track 1.5 ও Track 2) পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও নীতি নির্ধারকরা অংশ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। এর লক্ষ্য ছিল আস্থা তৈরি এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক যোগাযোগের ভিত্তি প্রস্তুত করা।
পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিকদের মতে, এই ধরনের অনানুষ্ঠানিক সংলাপ পূর্ণাঙ্গ আলোচনার বিকল্প না হলেও সংকট এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
২০২৫ সালের সংঘাত ও যুদ্ধবিরতির পর দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। পাকিস্তানের সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান কিছু ক্ষেত্রে শক্তিশালী হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও কিছু টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে উন্নত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে, যা আঞ্চলিক ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তবে উত্তেজনা কমেনি। ভারতের সেনাপ্রধান সম্প্রতি পাকিস্তানকে কঠোর বার্তা দিয়ে বলেন, যদি সন্ত্রাসবাদে সমর্থন অব্যাহত থাকে, তবে এর পরিণতি গুরুতর হবে। এর জবাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ওই মন্তব্যকে “উস্কানিমূলক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন” বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
দুই দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক বক্তব্যে এই ধরনের পাল্টাপাল্টি অবস্থান সম্পর্কের গভীর বিভাজনকেই তুলে ধরছে।
এদিকে সিন্ধু নদীর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়েও দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক একটি ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর পাকিস্তান স্বাগত জানালেও ভারত ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।
ভারত এর আগে ২০২৫ সালে একটি হামলার পর চুক্তিটি স্থগিত করে, যা দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের পানি ব্যবস্থাপনার ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংলাপের পক্ষে কিছু কণ্ঠস্বর উঠলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে ভারত–পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।
তাদের মতে, সীমিত কূটনৈতিক যোগাযোগ থাকলেও পূর্ণাঙ্গ আলোচনা শুরু করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।