- ০১ জুলাই, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান বজায় রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকায় নীতি সুদহার (পলিসি রেট) আগের মতোই ১০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের উপস্থিতিতে নতুন মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডেপুটি গভর্নর হাবীবুর রহমান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগের মুদ্রানীতিতে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে মে মাস পর্যন্ত প্রকৃত প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডেপুটি গভর্নর হাবীবুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত ৬ থেকে ৭ শতাংশের পরিবর্তে বর্তমানে ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনা, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা—দুই লক্ষ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিক ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা এবং বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা পর্যালোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, আগামী ছয় মাসে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক গতি ফিরে আসবে।
মুদ্রানীতিতে সরকারের ঘোষিত বাজেট লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান খেলাপি ঋণ কমাতে আগামী ১৮ মাসের একটি কর্মপরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, প্রকৃত আর্থিক সংকটে থাকা কিন্তু ব্যবসা পরিচালনায় সক্ষম ঋণগ্রহীতাদের জন্য এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে আগের মতো পুনঃতফসিলিকরণকে আর উৎসাহিত করা হবে না।
তিনি আরও জানান, আগামী বছরে অর্থঋণ আদালত আইন এবং সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি চলছে। প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে অর্থঋণসংক্রান্ত মামলার বিচার ছয় মাসের মধ্যে শেষ করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সীমার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ব্যাংকের নিজস্ব আর্থিক বিবরণীতে রাখা যাবে না; সেগুলো সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি অনুসরণের ঘোষণা দিয়ে গভর্নর বলেন, ভবিষ্যতে কোনো ধরনের বিধি লঙ্ঘন ধরা পড়লে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ব্যাংকটি নিয়ে অযাচিত গুঞ্জন বা অনুমাননির্ভর আলোচনা থেকে বিরত থাকা উচিত। তিনি জানান, ব্যাংকটির তারল্য সংকট মোকাবিলায় ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৩ হাজার কোটি টাকার সহায়তা দিয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
নতুন মুদ্রানীতিতে ২০২৭ সালের জুন নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি খাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া নিয়ন্ত্রিতভাবে অর্থ সরবরাহ বাড়ানো, অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি না করে বাজারে প্রয়োজনীয় অর্থপ্রবাহ বজায় রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই নতুন মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্য।