- ০২ অক্টোবর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
ঘাসের ওপর পড়ে থাকা শিউলি ফুল, ভোরের শিশির আর শরতের নরম আলো অক্টোবর এলেই প্রকৃতির এই দৃশ্যগুলো অনেকের মনে তৈরি করে এক ধরনের নস্টালজিয়া। দুর্গাপূজার আবহের সঙ্গে মিশে থাকা সেই অনুভূতির মধ্যেই হঠাৎ মনে পড়ে যেতে পারে সুজিত সরকার পরিচালিত হিন্দি সিনেমা ‘অক্টোবর’-এর কথা।
২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি বক্স অফিসে বড় সাফল্য পায়নি। মুক্তির সময়ও তেমন আলোড়ন তৈরি করতে পারেনি ছবিটি। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, বিশেষ করে অক্টোবর মাস এলেই সিনেমাটিকে ঘিরে দর্শকদের আগ্রহ নতুন করে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরে আসে ছবির দৃশ্য, আবহ, চরিত্র ও সংলাপ। মুক্তির আট বছর পরও এমন স্মৃতিচারণই প্রশ্ন তোলে—কী এমন আছে ‘অক্টোবর’-এ, যা দর্শকের মনে এতটা দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলেছে?
সুজিত সরকার সাধারণত প্রচলিত বলিউডের ছকে সিনেমা নির্মাণ করেন না। ‘ভিকি ডোনার’, ‘মাদ্রাজ ক্যাফে’ কিংবা ‘পিকু’-তে তাঁর নিজস্ব নির্মাণভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। তবে আগের সিনেমাগুলোতে জনপ্রিয় তারকা, গান কিংবা বাণিজ্যিক উপাদানের উপস্থিতি ছিল। ‘অক্টোবর’-এ সেই পরিচিত উপকরণ অনেকটাই অনুপস্থিত।
সিনেমাটিতে তখনকার বাণিজ্যিক ছবির পরিচিত মুখ বরুণ ধাওয়ানকে দেখা যায় ড্যান চরিত্রে। বিপরীতে বানিতা সান্ধুর জন্য এটি ছিল অভিনয়ে বড় পর্দায় অভিষেক। ফলে সিনেমাটি শুরু থেকেই ছিল প্রচলিত রোমান্টিক বলিউড ছবির চেয়ে আলাদা।
‘অক্টোবর’-এর গল্প মূলত ড্যান ও শিউলিকে ঘিরে। একটি হোটেলে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করার সময় দুজনের পরিচয়। হঠাৎ একদিন হোটেলের তৃতীয় তলা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয় শিউলি। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে জানা যায়, দুর্ঘটনার আগে সে ড্যানের কথা জানতে চেয়েছিল।
এই একটি তথ্যই ড্যানের ভেতরে গভীর পরিবর্তন আনে। শিউলির সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রকৃতি কী, সেই প্রশ্নের সহজ উত্তর সিনেমাটি দেয় না। বরং শিউলি অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে থাকার সময় ড্যানের প্রতিদিন সেখানে উপস্থিত হওয়া, অপেক্ষা করা এবং তার প্রতি এক অদ্ভুত টান অনুভব করার মধ্য দিয়ে গল্প এগিয়ে যায়।
শিউলির নামের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে ফুলের একটি গল্প। তার বাবা শিউলি ফুলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই মেয়ের নাম রেখেছিলেন শিউলি। স্বল্পস্থায়ী এই ফুল রাতের শেষে ভোরের আলো ফুটতেই ঝরে পড়ে। সিনেমার চরিত্রটির পরিণতির সঙ্গেও যেন সেই নামের একটি প্রতীকী সম্পর্ক তৈরি হয়।
ছবিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর নীরবতা। প্রচলিত অর্থে এখানে বড় কোনো প্রেমের ঘোষণা নেই, নেই অতিরিক্ত সংলাপ কিংবা নাচ-গানের আয়োজন। বরং হাসপাতালের করিডর, অপেক্ষা, প্রকৃতি, মানুষের নিঃসঙ্গতা এবং অপ্রকাশিত অনুভূতির মধ্য দিয়েই সম্পর্কের গল্প বলা হয়েছে। তাই ‘অক্টোবর’কে শুধু দেখার সিনেমা না বলে অনুভবের সিনেমা বললেও অত্যুক্তি হয় না।
সিনেমাটির আবহে বাঙালি দর্শকের কাছে পরিচিত এক ধরনের কোমলতা খুঁজে পাওয়া যায়। নির্মাতা সুজিত সরকার, চিত্রগ্রাহক অভীক মুখোপাধ্যায় এবং সংগীত পরিচালক শান্তনু মৈত্র—তিনজনই বাঙালি। ছবির প্রকৃতি, সংগীত ও আবেগের ব্যবহারে সেই সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার ছাপও অনেক দর্শকের কাছে আলাদাভাবে ধরা দিয়েছে।
‘অক্টোবর’-এর গল্পের পেছনে নির্মাতার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতারও প্রভাব রয়েছে। মৃত্যুর আগে সুজিত সরকারের মা দীর্ঘ সময় দিল্লির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেই সময়ে মায়ের পাশে হাসপাতালে বসে থাকার অভিজ্ঞতা নির্মাতার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। বহু বছর পর সেই অনুভূতি ও অপেক্ষার অভিজ্ঞতাই সিনেমার গল্পে নতুন রূপ পেয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় সিনেমাটির প্রতি দর্শকের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। হাসপাতালের বিছানায় থাকা প্রিয়জন, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং কাছের মানুষকে হারানোর আশঙ্কার সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পান অনেকেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তখন নতুন করে আলোচনায় আসে ‘অক্টোবর’।
মুক্তির সময় যে সিনেমা ব্যাপক ব্যবসা কিংবা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল না, সেটিই পরবর্তী সময়ে দর্শকের ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। এ ধরনের সিনেমার সাফল্য সবসময় বক্স অফিসের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। বরং সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কোনো ছবি দর্শকের মনে জায়গা ধরে রাখতে পারছে কি না, সেটিই হয়ে ওঠে তার আলাদা পরিচয়ের অংশ।
‘অক্টোবর’ ঠিক তেমনই একটি সিনেমা। প্রকৃতি, অপেক্ষা, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ আর নীরব অনুভূতিকে ধীরগতির গল্পে ধারণ করেছে ছবিটি। আর অক্টোবরের বাতাসে শরৎ, শিউলি ও শিশিরের গন্ধ ফিরে এলেই হয়তো দর্শকের মনে আবারও বাজতে থাকে সেই নীরব সিনেমার আবহ।
তবে সিনেমাটির সঙ্গে সবচেয়ে মজার বৈপরীত্যও এখানেই শিউলি ফুলের সঙ্গে যার এত গভীর সম্পর্ক, সেই ‘অক্টোবর’ মুক্তি পেয়েছিল এপ্রিলে। তাই মুক্তির সময় শরতের আবহ না থাকলেও বছর ঘুরে অক্টোবর এলেই ছবিটি যেন নিজের প্রকৃত ঋতু খুঁজে পায়।