Sunday, January 11, 2026

ক্রিকেটে রাজনীতির ছায়া: মুস্তাফিজুর ইস্যুতে দক্ষিণ এশিয়ার ক্রীড়া-কূটনীতি


২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ভারত–বাংলাদেশ ম্যাচে একটি বল করার পর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন বাংলাদেশের মুস্তাফিজুর রহমান। (ছবিঃ আলতাফ কাদরি/এপি/আল জাজিরা)

দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বাংলাদেশি পেস তারকা মুস্তাফিজুর রহমান–এর আইপিএল অধ্যায়ের আকস্মিক সমাপ্তি। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই–এর এক নির্দেশে শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায় তার আইপিএল ২০২৬ যাত্রা। এই সিদ্ধান্ত কেবল একজন খেলোয়াড়ের ভাগ্য বদলায়নি; বরং ক্রিকেট, রাজনীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতির জটিল সম্পর্ককে আবারও নগ্নভাবে সামনে এনেছে।

এক সিদ্ধান্তে বদলে গেল সব

আইপিএল শুরুর আগে মুস্তাফিজুরকে প্রায় ৯.২ মিলিয়ন রুপিতে দলে নিয়েছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। ফ্র্যাঞ্চাইজিটির মালিকানায় রয়েছে রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট, যার সঙ্গে বলিউড তারকা শাহরুখ খান যুক্ত। তবে ইনজুরি বা পারফরম্যান্স নয়—‘সামগ্রিক পরিস্থিতির পরিবর্তন’ দেখিয়ে বোর্ডের হস্তক্ষেপে কেকেআরকে বাংলাদেশি এই পেসারকে ছেড়ে দিতে বলা হয়।

ক্রিকেট মহলে এই ব্যাখ্যাকে অস্পষ্ট ও নজিরবিহীন বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ক্রিকেট

২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অস্বস্তি বাড়তে থাকে। সেই উত্তেজনার প্রভাব ধীরে ধীরে ক্রীড়াক্ষেত্রেও পড়তে শুরু করে। মুস্তাফিজুরকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই প্রবণতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

দ্রুত বিকল্প, বড় প্রতিক্রিয়া

আইপিএল থেকে বাদ পড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মুস্তাফিজুর নাম লেখান পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল)–এ, আট বছর পর যেখানে তার প্রত্যাবর্তন ঘটে। এই পদক্ষেপ নতুন মাত্রা যোগ করে বিতর্কে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং এটিকে ‘অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক’ বলে অভিহিত করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়—যা ক্রিকেটপ্রেমী দেশটিতে নজিরবিহীন ঘটনা।

আইসিসির ভূমিকা ও নিরাপত্তা প্রশ্ন

ইস্যুটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গড়ালে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) মধ্যস্থতায় আসে। বিসিবি জানায়, আইসিসি বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা ও পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে এবং আইসিসি মেনস টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬–এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগের অবকাশ নেই। তবু ভারতের ভেন্যুতে ম্যাচ আয়োজন নিয়ে শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি।

ভারতের ভেতরের বিতর্ক

ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি আলোচনার জন্ম দেয়। ক্ষমতাসীন দলের এক নেতা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ক্রীড়া বিনিময় সীমিত করার পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে বিরোধী কংগ্রেসের নেতা শশী থারুর খেলাধুলাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার না করার আহ্বান জানান।

ভারতের প্রভাব ও ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের প্রভাব অনস্বীকার্য। বিপুল দর্শকসংখ্যা ও আয়ের কারণে বিসিসিআই কার্যত ক্রিকেট অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। আইসিসির বর্তমান প্রধান জয় শাহ, যিনি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ–এর পুত্র। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি–এর সরকারের সময়ে ক্রিকেট যে কেবল খেলা নয়, কৌশলগত শক্তি—তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

মুস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল অধ্যায়ের আকস্মিক ইতি দেখিয়ে দিল, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেট আর শুধু ব্যাট–বলের লড়াই নয়; এটি রাজনীতি, কূটনীতি ও শক্তির বার্তাবাহক। প্রশ্ন উঠছে, যে খেলাটি একসময় দেশগুলোর মধ্যে সেতু গড়েছিল, সেটিই কি এখন বিভাজনের নতুন রেখা টানছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন