- ১০ জানুয়ারি, ২০২৬
PNN আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চলমান গৃহযুদ্ধ, সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মধ্যেই মিয়ানমারে তিন ধাপে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। রোববার সকাল ৬টা থেকে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের অন্তত ১০০টি টাউনশিপে ভোটকেন্দ্র খোলা হয়।
এই ধাপে ভোট হচ্ছে সাগাইং, মাগওয়ে, মান্দালয়, বাগো ও তানিনথারিই অঞ্চলের পাশাপাশি মন, শান, কাচিন, কায়াহ ও কায়িন রাজ্যের অংশবিশেষে। তবে এসব এলাকার অনেক স্থানেই সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংঘর্ষ হয়েছে অথবা এখনো কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করার পর থেকেই মিয়ানমার দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জর্জরিত। ওই অভ্যুত্থানে গ্রেপ্তার হন দেশটির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চি। এর পর থেকেই ৫ কোটি ১০ লাখ মানুষের এই দেশ কার্যত গৃহযুদ্ধের মধ্যে পড়ে।
অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ২০২০ সালের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করলেও এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। সামরিক সরকারের নির্ধারিত সময়ে নিবন্ধন না করায় দলটি ও আরও বহু বিরোধী ও সামরিকবিরোধী রাজনৈতিক দলকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
চলমান সংঘাতের কারণেই নির্বাচন তিন ধাপে ভাগ করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রথম ধাপে ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে ১০২টিতে ভোট হয়। তৃতীয় ও শেষ ধাপ নির্ধারিত হয়েছে ২৫ জানুয়ারি। তবে অন্তত ৬৫টি টাউনশিপে সংঘর্ষ চলমান থাকায় সেখানে ভোটই হচ্ছে না।
প্রথম ধাপের ভোট শেষে সামরিক কর্তৃপক্ষ ৫২ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির দাবি করে। একই সঙ্গে সামরিক সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) দাবি করেছে, তারা নিম্নকক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক আসনের ৮০ শতাংশের বেশি জিতেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউএসডিপি কার্যত সেনাবাহিনীরই বেসামরিক মুখ।
আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষক রিচার্ড হর্সি বলেন, “এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠ সম্পূর্ণভাবে একপাক্ষিক। শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এমন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যা বিরোধিতা দমন করে।”
রোববার সকালে রাজধানী ইয়াঙ্গুনে স্কুল, সরকারি ভবন ও ধর্মীয় স্থাপনায় ভোট দিতে দেখা যায় সাধারণ মানুষকে। অং সান সু চির সাবেক নির্বাচনী এলাকা কাওহমুতেও ভোটগ্রহণ হয়েছে।
ভোট দিয়ে বেরিয়ে ৫৪ বছর বয়সী কৃষক থান থান সিন্ট বলেন, তিনি শান্তির আশায় ভোট দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “সমস্যা অনেক, সমাধান ধীরে আসবে। তবু আমার মনে হয় নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হবে।”
তবে অনেকেই আশাবাদী নন। নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইয়াঙ্গুনের এক বাসিন্দা বলেন, “ফলাফল আগেই নির্ধারিত। মানুষের এই নির্বাচনে কোনো আগ্রহ নেই। আমাদের দুর্ভোগ থেকে মুক্তির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।”
জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। জাতিসংঘ-এর মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক টম অ্যান্ড্রুজ বলেছেন, “এটি কোনোভাবেই অবাধ, সুষ্ঠু বা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নয়। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার জন্য সাজানো এক নাটক।”
সামরিক সরকার নির্বাচনের আগে যে আইনগুলো কার্যকর করেছে, তাতে ভোট নিয়ে সমালোচনা বা প্রতিবাদ করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এসব আইনে ইতোমধ্যে দুই শতাধিক মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক অভিযোগে বর্তমানে প্রায় ২২ হাজার মানুষ কারাবন্দী রয়েছে বলে জানিয়েছে অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স।