- ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধে প্রাণহানির প্রকৃত চিত্র পূর্ববর্তী সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে নতুন একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশ্বের প্রভাবশালী চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকীতে প্রকাশিত স্বাধীন গবেষণাগুলোতে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত “সহিংস মৃত্যুর” সংখ্যা ৭৫ হাজারেরও বেশি।
জনসংখ্যাভিত্তিক ‘গাজা মর্টালিটি সার্ভে’ নামের এক গবেষণা, যা The Lancet Global Health–এ প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আনুমানিক ৭৫ হাজার ২০০ জনের সহিংস মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। এই সংখ্যা গাজার যুদ্ধ-পূর্ব প্রায় ২২ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৩.৪ শতাংশ। একই সময়ের জন্য গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের (MoH) হিসাব ছিল প্রায় ৪৯ হাজারের কিছু বেশি, যা গবেষকদের মতে প্রকৃত সংখ্যার নিম্নসীমা বা ‘ফ্লোর’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত মোট নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ছাড়িয়েছে। এমনকি ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও কয়েক শত মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। যদিও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, দেশটির সামরিক বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানুয়ারিতে সাংবাদিকদের জানান, যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে—এমন হিসাব তারা মেনে নিচ্ছেন।
গবেষণাটিতে প্রায় দুই হাজার পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, যা ৯ হাজারের বেশি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। গবেষকদের ভাষ্য, হাসপাতাল ও প্রশাসনিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক মৃত্যুর নথিভুক্তি সম্ভব হয়নি। ফলে সরকারি রেকর্ড বাস্তবতার তুলনায় কম দেখাতে পারে।
এর আগে The Lancet–এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় পরিসংখ্যানগত মডেল ব্যবহার করে যুদ্ধের প্রথম নয় মাসে ৬৪ হাজারের বেশি মৃত্যুর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। নতুন জরিপটি সরাসরি পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সেই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে।
গবেষকরা আরও উল্লেখ করেন, নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষের হার ৫৬ শতাংশের বেশি—যা সরকারি তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সহিংস মৃত্যুর পাশাপাশি “অসহিংস অতিরিক্ত মৃত্যু” নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জরিপে আনুমানিক ১৬ হাজারের বেশি এমন মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ মৃত্যু জীবনযাত্রার অবনতি, অবরোধ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার ভেঙে পড়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
২০২৫ সালের মে মাস নাগাদ গাজার ৩৬টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১২টি আংশিকভাবে কার্যক্রম চালাতে সক্ষম ছিল। শয্যাসংখ্যা নেমে আসে প্রায় ২ হাজারে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় অনেক কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুনর্গঠনমূলক সার্জারির প্রয়োজন এমন আহতের সংখ্যা ২৯ হাজার থেকে ৪৬ হাজারের মধ্যে হতে পারে। বর্তমান সক্ষমতায় এসব অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করতে প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে।
গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, বহু মানুষ গুরুতর আঘাত নিয়ে বেঁচে থাকলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেলে স্থায়ী অক্ষমতার ঝুঁকিতে পড়বেন। বিস্ফোরণজনিত আঘাত, দগ্ধ হওয়া এবং সংক্রমণের জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
গবেষকরা “মৃত্যুর ধূসর অঞ্চল”–এর কথাও উল্লেখ করেছেন, যেখানে সরাসরি হামলায় নয়, বরং আঘাত-পরবর্তী সংক্রমণ, অপুষ্টি বা চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু ঘটছে। এসব মৃত্যু প্রকৃত প্রাণহানির পরিসংখ্যানকে আড়াল করতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিক গবেষণা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জবাবদিহি ও যুদ্ধবিরতির দাবি আরও জোরালো করছে। তারা বলছেন, বেসামরিক অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর হামলা বন্ধ না হলে মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে।
গাজায় চলমান পরিস্থিতি শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানিই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও স্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে—এমনটাই প্রতিফলিত হয়েছে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে।