- ১৫ জুলাই, ২০২৬
স্পোর্টস ডেস্ক: PNN
বড় ম্যাচে প্রায়ই বলা হয়, তারকাদের নয়, জয় এনে দেয় দল। মঙ্গলবার রাতে আর্লিংটনের ডালাস স্টেডিয়ামে সেই কথারই বাস্তব প্রমাণ দিল স্পেন। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিজে তারকাখচিত ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে ২-০ গোলের জয়ে ২০১০ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে গেল লা রোহা।
ম্যাচের স্কোরলাইন হয়তো ২-০। কিন্তু পুরো ৯০ মিনিটের গল্প বলছে আরও বড় কিছু। স্পেন শুধু ফ্রান্সকে হারায়নি, তাদের নিজেদের খেলাই খেলতে দেয়নি। বলের দখল, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণে শৃঙ্খলা, সব মিলিয়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল আবারও প্রমাণ করেছে, এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে পরিপূর্ণ দল তারাই।
ম্যাচের শুরুতে অবশ্য দুই দলই ছিল সতর্ক। ফ্রান্স উচ্চ প্রেসিংয়ের মাধ্যমে স্পেনের বিল্ডআপ নষ্ট করার চেষ্টা করে। কিন্তু রদ্রি, ফাবিয়ান রুইস ও দানি ওলমো ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেন। মাঝমাঠে তিন বনাম দুইয়ের লড়াইয়ে বারবার পিছিয়ে পড়ে ফরাসিরা। ফলে এমবাপ্পে কিংবা দেম্বেলের কাছে কার্যকরভাবে বল পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
স্পেনের আধিপত্যের প্রথম পুরস্কার আসে ২২ মিনিটে। ডান প্রান্ত দিয়ে বক্সে ঢুকে পড়া লামিনে ইয়ামালকে ফাউল করেন ফরাসি ডিফেন্ডার। রেফারি কোনো দ্বিধা না করে পেনাল্টির বাঁশি বাজান। স্পটকিক থেকে ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে স্পেনকে এগিয়ে দেন অধিনায়ক মিকেল ওয়ারজাবাল। মাইক মেইনিয়ান দিক ঠিক করলেও শটের নিখুঁত প্লেসমেন্টে কিছুই করার ছিল না তার।
গোল হজমের পর প্রত্যাশা ছিল ফ্রান্স আক্রমণের তীব্রতা বাড়াবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো চিত্র। স্পেনের প্রেসিংয়ের সামনে ফরাসি মিডফিল্ড বারবার ভুল পাস খেলেছে। এমবাপ্পেকে ঘিরে রেখেছেন পাউ কুবার্সি, আয়মেরিক লাপোর্তে ও মার্ক কুকুরেয়া। দেম্বেলে কিংবা অলিজেও উইং দিয়ে কাঙ্ক্ষিত জায়গা বের করতে পারেননি।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে লামিনে ইয়ামাল একবার বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়। তবে ততক্ষণে ম্যাচের গতি পুরোপুরি স্পেনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্স কিছুটা আক্রমণাত্মক হয়ে মাঠে ফিরলেও তাদের আশা কার্যত শেষ হয়ে যায় ৫৮তম মিনিটে। দানি ওলমোর সঙ্গে চমৎকার ওয়ান-টু পাস খেলে ডান দিক থেকে বক্সে ঢুকে নিখুঁত শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন রাইট-ব্যাক পেদ্রো পোরো। রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হয়েও আক্রমণে উঠে এসে যে পরিণত ফিনিশিং তিনি দেখিয়েছেন, তা ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর দিদিয়ে দেশঁ একের পর এক পরিবর্তন আনেন। থিও হার্নান্দেজ, রায়ান শেরকি, মানু কোনেদের মাঠে নামানো হয়। কিন্তু স্পেনের সুসংগঠিত রক্ষণে কোনো ফাটল ধরাতে পারেনি ফ্রান্স। পুরো ম্যাচে এমবাপ্পে কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিলেন। গোলমুখে তাদের পরিষ্কার সুযোগ ছিল হাতে গোনা। উনাই সিমনের গোলও বড় কোনো পরীক্ষার মুখে পড়েনি।
ম্যাচ শেষে হতাশা লুকাননি ফরাসি অধিনায়ক এমবাপ্পেও। তার ভাষায়, "কৌশলগতভাবে, প্রযুক্তিগতভাবে—কোনো দিক থেকেই আমরা আমাদের খেলাটা খেলতে পারিনি। স্পেন তাদের পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করেছে, আর আমরা ম্যাচের গতি বদলাতে ব্যর্থ হয়েছি।"
অন্যদিকে এই জয় স্পেনের ধারাবাহিকতার আরেকটি প্রমাণ। চলতি বিশ্বকাপে সাত ম্যাচে এটি তাদের ষষ্ঠ ক্লিন শিট। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করেছে দলটি। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাদের অপরাজিত যাত্রাও অব্যাহত রয়েছে।
ফ্রান্সের জন্য এটি কেবল একটি পরাজয় নয়; টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্নও শেষ হয়ে গেল এই হারে। অন্যদিকে স্পেনের সামনে এখন ইতিহাস গড়ার সুযোগ। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের পর দীর্ঘ ১৬ বছর অপেক্ষা করেছে তারা। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন এখন আর মাত্র একটি ম্যাচ দূরে।
এখন স্পেন অপেক্ষা করবে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার দ্বিতীয় সেমিফাইনালের বিজয়ীর জন্য। তবে মঙ্গলবারের পারফরম্যান্স একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—এই বিশ্বকাপে ট্রফি জিততে হলে সবার আগে ভাঙতে হবে স্পেনের দুর্ভেদ্য রক্ষণ, আর সেটিই এখন সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।