- ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধ তৃতীয় বছরে গড়ানোর মধ্যেই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দেশটির করদোফান অঞ্চলে ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় অন্তত ১০৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। ডিসেম্বরের শুরু থেকে শুক্রবার পর্যন্ত এসব হামলা চলে বলে স্থানীয় সূত্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক সহিংসতা তীব্র হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সেনাঘাঁটি দখলকে ঘিরে। সপ্তাহব্যাপী তীব্র লড়াইয়ের পর পশ্চিম করদোফানের বাবনুসায় ওই ঘাঁটি দখল করে নেয় আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)। এর পর থেকেই করদোফানের বিস্তীর্ণ এলাকায় হামলা ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে দক্ষিণ করদোফানের কালোগি এলাকায়। সেখানে একটি কিন্ডারগার্টেন ও একটি হাসপাতালে ড্রোন হামলায় ৮৯ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৪৩ জন শিশু ও ৮ জন নারী ছিলেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার টুর্ক এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, চিকিৎসা স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।
এদিকে ১৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ করদোফানের রাজধানী কাদুগলিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একটি ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ ঘটনাকে ‘ভয়াবহ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
এর পরদিন দিলিং সামরিক হাসপাতালে হামলার ঘটনা ঘটে। চিকিৎসক সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সেখানে অন্তত নয়জন নিহত ও ১৭ জন আহত হন। জাতিসংঘ কর্মকর্তারা জানান, নিহত ছয়জন এবং আহত ১২ জনের অনেকেই চিকিৎসাকর্মী ছিলেন।
সরকারপন্থী সুদানি সেনাবাহিনী (এসএএফ) এসব হামলার জন্য আরএসএফকে দায়ী করেছে। তবে এখনো এ বিষয়ে আরএসএফের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সহিংসতার পাশাপাশি করদোফানে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। উত্তর করদোফানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সেখানে ১৩ হাজারের বেশি কলেরা ও ৭৩০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। সংঘাতের কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে।
উত্তর করদোফান থেকে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। কাদুগলি ও দিলিংয়ের মতো অবরুদ্ধ শহরে বহু মানুষ এখনো আটকে রয়েছেন। পাশের হেগলিগ এলাকা থেকেও প্রায় দুই হাজার মানুষ হোয়াইট নাইল প্রদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, করদোফানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়া সুদানের যুদ্ধের নতুন ও বিপজ্জনক অধ্যায় নির্দেশ করছে। এর আগে পশ্চিম দারফুরে সেনাবাহিনীর শেষ ঘাঁটি পতনের পরই এই বিস্তার ঘটেছে।
এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে শান্তি প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি সুদানি সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান সৌদি আরবের যুবরাজের সঙ্গে বৈঠক করে শান্তি আলোচনায় আগ্রহের কথা জানান। একই সঙ্গে মিসর ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে সুদান বিভক্ত করার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করে সার্বিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন অন্তত ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। মানবিক সংস্থাগুলোর মতে, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। সুদানকে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।