Monday, January 19, 2026

সিরিয়ায় যুদ্ধবিরতি সুসংহত করতে মুখোমুখি হচ্ছেন আল-শারা ও এসডিএফ প্রধান আবদি


ছবিঃ ২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি দামেস্কের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর বক্তব্য দিচ্ছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। (সংগৃহীত | আল জাজিরা । রামি আল সাইয়েদ/এএফপি)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

উত্তর সিরিয়ায় কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর ও রাজনৈতিক সমঝোতা সুদৃঢ় করতে বৈঠকে বসছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা এবং কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)-এর প্রধান মাজলুম আবদি। সোমবার এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে রোববার নির্ধারিত বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছিল।

আলেপ্পো থেকে রাক্কা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় সিরীয় সেনাবাহিনী ও সরকার-সমর্থিত গোত্রীয় বাহিনীর অভিযানের পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পাল্টে যায়। এতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বড় অংশে আবারও কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই চাপের মুখে এসডিএফ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে এবং একটি বিস্তৃত চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হয়, যার আওতায় কুর্দি বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসন ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে আসবে।

রোববার টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে মাজলুম আবদি জানান, এসডিএফের ওপর এই সংঘাত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং এর পেছনে একাধিক পক্ষ জড়িত ছিল। তিনি যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়ার কথা নিশ্চিত করে বলেন, দামেস্ক থেকে ফিরে এসে তিনি চুক্তির শর্তাবলি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবেন।

এর আগে শনিবার (১৮ জানুয়ারি) দামেস্কে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন প্রেসিডেন্ট আল-শারা। চুক্তি ঘোষণার পর রাজধানী দামেস্কে জনসাধারণের মধ্যে স্বস্তি ও আনন্দের প্রকাশ দেখা যায়। আতশবাজি, গাড়ির হর্ন ও রাস্তায় উদ্‌যাপনের মধ্য দিয়ে বহু মানুষ দীর্ঘ সংঘাতের অবসানের আশায় মেতে ওঠে। তবে আনন্দের পাশাপাশি অনিশ্চয়তাও ছিল অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অতীত অভিজ্ঞতায় এই যুদ্ধবিরতি টেকসই নাও হতে পারে।

দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছরের সংঘাতে বিধ্বস্ত সিরিয়ায় যুদ্ধের ক্লান্তি এখন মানুষের প্রধান অনুভূতি। সাধারণ নাগরিকদের বড় অংশ শান্তি ও রাজনৈতিক সমাধান চান। অর্থনৈতিক দুরবস্থাও বড় উদ্বেগের বিষয়। অনুমান করা হচ্ছে, দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে, ফলে সহিংসতা বন্ধ হয়ে পুনর্গঠনের পথে এগোনোর আশা করছেন তারা।

এদিকে এসডিএফ জানিয়েছে, আরও রক্তপাত ঠেকাতে তারা দেইর আজ-জোর ও রাক্কা থেকে বাহিনী সরিয়ে হাসাকাহ অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত করেছে। সংগঠনটি স্বীকার করেছে যে সংঘর্ষে তাদের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে, তবে তারা নিজেদের অর্জন রক্ষায় দৃঢ় অবস্থানে থাকবে বলে জানিয়েছে।

সিরীয় প্রেসিডেন্সির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চুক্তির অংশ হিসেবে এসডিএফ যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোতে একীভূত করা হবে এবং রাক্কা, দেইর আজ-জোর ও হাসাকাহ অঞ্চলে সরকারি প্রশাসন পুনরায় মোতায়েন করা হবে। প্রেসিডেন্ট আল-শারা গোত্রীয় বাহিনীসহ সব পক্ষকে চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে সিরিয়া আবারও তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় আয়ের বড় উৎস হতে পারে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে লাভ আসবে না, তবে নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে পুনর্গঠনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে এসডিএফ যোদ্ধাদের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া এবং জটিল গোত্রীয় রাজনীতি সামাল দেওয়া। সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসা নতুন এলাকায় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামরিক শাসন থেকে বেসামরিক প্রশাসনে রূপান্তর করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নজরও উত্তর সিরিয়ার দিকে। মার্কিন বিশেষ দূতসহ আন্তর্জাতিক মহল চুক্তিটিকে একটি সম্ভাব্য মোড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ফোনে আল-শারার সঙ্গে কথা বলে সিরিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও ‘সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের’ ওপর জোর দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এর বাস্তবায়ন ও স্থায়িত্ব নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আন্তর্জাতিক ভূমিকার ওপর।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন