- ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে এসে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনায় মোড় নিয়েছে। ইউক্রেনের অভিযোগ, শান্তি আলোচনায় না গিয়ে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার লক্ষ্যেই রাশিয়া পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়াচ্ছে, যদিও চলতি বছরে সীমিত ভূখণ্ড দখলের বিনিময়ে তাদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ দাবি করেন, ইউক্রেন নাকি মস্কোর উত্তর-পূর্বে ভ্যালদাই হ্রদের কাছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারি বাসভবনে ড্রোন হামলার চেষ্টা চালিয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৯১টি দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয় এবং রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেগুলো ভূপাতিত করে। তবে পুতিন তখন বাসভবনে ছিলেন কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি তিনি।
এই অভিযোগ দ্রুতই নাকচ করে দেন ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা। তাঁর দাবি, এমন কোনো হামলাই ঘটেনি এবং রাশিয়া অভিযোগের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। পরবর্তীতে রাশিয়া যে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের ছবি প্রকাশ করে, সেগুলো থেকেও হামলার স্থান, সময় বা উৎস নিশ্চিত করা যায়নি।
রুশ বিরোধী গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকরাও এই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছে। তাঁদের মতে, ভ্যালদাই এলাকার আকাশসীমা অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং সেখানে এত বিপুল ড্রোন প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব। এমনকি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক ও পরবর্তী ঘোষণার মধ্যেও ড্রোনের সংখ্যা ও অবস্থান নিয়ে অসঙ্গতি দেখা গেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার জানায়, ইউক্রেনীয় হামলার ক্ষেত্রে যেসব দৃশ্যমান প্রমাণ সাধারণত পাওয়া যায় ভিডিও, স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফুটেজ এক্ষেত্রে তার কোনোটিই পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনার সময়টাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ ওঠার একদিন আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক শেষে ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার আশ্বাস পান। ইউরোপীয় নেতাদের কেউ কেউ তখন ২০২৬ সালের শুরুতেই যুদ্ধ অবসানের সম্ভাব নার কথা বলেন।
তবে লাভরভের বক্তব্য সেই আশাবাদে ছেদ ফেলে। তিনি জানান, রাশিয়া তাদের আলোচনার অবস্থান পুনর্বিবেচনা করবে। একই দিনে পুতিন দক্ষিণ ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের বাকি অংশ দখলের নির্দেশ দেন, যেখানে রাশিয়া ইতোমধ্যে বেশির ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।
জেলেনস্কির অভিযোগ, শান্তি আলোচনার পথ এড়াতেই রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা বাড়ানোর অজুহাত খুঁজছে। যদিও ট্রাম্প প্রকাশ্যে রাশিয়ার অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইউক্রেন পুতিনের বাসভবন লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি।
এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার দাবি ও বাস্তবতার মধ্যেও ফারাক স্পষ্ট। রুশ সামরিক নেতৃত্ব ২০২৫ সালে হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড দখলের দাবি করলেও স্বাধীন বিশ্লেষণে এর পরিমাণ কম বলে উঠে এসেছে। ইউক্রেনীয় সেনাপ্রধানের হিসাবে, এই সীমিত অগ্রগতির বিনিময়ে রাশিয়ার প্রায় চার লাখের বেশি সেনা হতাহত হয়েছে।
২০২৫ সালের শেষ সপ্তাহেও রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, অধিকাংশ ড্রোন ও বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বছরের শেষেও যুদ্ধ বন্ধের চেয়ে তথ্যযুদ্ধ, পারস্পরিক অভিযোগ ও সামরিক চাপই রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাতের মূল চিত্র হয়ে রইল।
তথ্যসুত্রঃ আল জাজিরা