Thursday, October 15, 2026

অনলাইনে গুজব ও অপপ্রচার ছড়ানোর আগেই শনাক্ত করবে এআই, নজর কাড়ছে গুডিয়া


প্রতীকী ছবিঃ গুডিয়া (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছোট পোস্ট, বিভ্রান্তিকর তথ্য কিংবা ক্ষতিকর গুজব মুহূর্তেই বড় বিতর্কে রূপ নিতে পারে। এতে কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি তৈরি হতে পারে ব্যবসায়িক ও সামাজিক সংকট। এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই অনলাইনে তথ্যের গতিপথ বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুডিয়া (Gudea)।

প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের পরিচয় দেয় ইন্টারনেটের ‘ঝড় শনাক্তকারী’ হিসেবে। তাদের প্রযুক্তির লক্ষ্য শুধু অনলাইনে কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে কত আলোচনা হচ্ছে, তা গণনা করা নয়; বরং কারা সেই আলোচনা ছড়াচ্ছে, কোন পথে তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে, কত দ্রুত তা জনপ্রিয় হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে, সেসব বিষয় বিশ্লেষণ করা।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে টেকক্রাঞ্চ ডিসরাপ্ট ২০২৬-এর ‘স্টার্টআপ ব্যাটলফিল্ড’ মঞ্চে নিজেদের প্রযুক্তি ও পরিকল্পনা তুলে ধরে গুদিয়া। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কিথ প্রেসলি সেখানে বলেন, অনলাইনে সুনাম রক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও আগাম প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

প্রচলিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণব্যবস্থা সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম কতবার উল্লেখ করা হয়েছে, কোন হ্যাশট্যাগ ব্যবহার হয়েছে কিংবা কত মানুষ পোস্ট দেখেছেন—এ ধরনের পরিসংখ্যান দেয়। গুদিয়ার দাবি, তাদের প্রযুক্তি এর বাইরে গিয়ে আলোচনার পেছনের নেটওয়ার্ক ও তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটির এআই ব্যবস্থা এক্স, রেডিট ও টিকটকসহ মূলধারার এবং বিকল্প ধারার ৫০০টির বেশি ওয়েবসাইট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করে। এর মাধ্যমে কোনো গুজব বা বিতর্কের সূত্রপাত কোথায়, কারা সেটিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং কোন গোষ্ঠী বা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তা বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছাচ্ছে, সে সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করে প্রযুক্তিটি।

কিথ প্রেসলির ভাষ্য, বড় বড় প্রতিষ্ঠান এখনো অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো ধরনের পর্যবেক্ষণ সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করছে। এসব ব্যবস্থায় আলোচনা বা হ্যাশট্যাগের সংখ্যা জানা গেলেও, পরিস্থিতি কেন তৈরি হচ্ছে এবং তা মোকাবিলায় কী করা উচিত, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট সব সময় পাওয়া যায় না।

২০২৩ সালে কিথ প্রেসলি, জনাথন স্পারবার ও জেমস থমিন মিলে গুডিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। প্রেসলির রাজনৈতিক প্রচারাভিযান ও প্রতিরক্ষা খাতে ১৫ বছরের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি অ্যান্ড্রু ইয়াংয়ের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারের অবকাঠামো তৈরির কাজেও যুক্ত ছিলেন।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কৌশল কর্মকর্তা জনাথন স্পারবারের অভিজ্ঞতা রয়েছে অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা নিয়ে গবেষণায়। আর প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা জেমস থমিন রাসায়নিক প্রকৌশলে পিএইচডি করেছেন এবং প্রায় দুই দশক ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং নিয়ে কাজ করছেন।

প্রেসলি জানান, শুরুতে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা তাঁদের ছিল না। ২০২০ সালের নির্বাচনের পর গড়ে ওঠা অলাভজনক উদ্যোগ জর্জ ওয়াশিংটন ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে তাঁদের কাজ শুরু হয়। বিদেশে আল-কায়েদা ও আইএসের মতো গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনলাইন নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও ব্যাহত করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যে কৌশল ব্যবহার করত, সেই অভিজ্ঞতা দেশের অভ্যন্তরীণ তথ্য প্রচারণা বিশ্লেষণে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন তাঁরা।

কাজ করতে গিয়ে তাঁরা বুঝতে পারেন, বিদ্যমান সরঞ্জামগুলো অনলাইনে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মধ্যে তথ্য কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তা যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারছে না। এই সীমাবদ্ধতা থেকেই গুদিয়ার প্রযুক্তি তৈরির ধারণা আসে।

প্রতিষ্ঠানটির মতে, জেনারেটিভ এআইয়ের বিস্তার অনলাইনে বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার কাজকে অনেক সহজ করেছে। আগে সমন্বিত প্রচারণা চালাতে যে পরিমাণ লোকবল ও অর্থ প্রয়োজন হতো, এখন উপযুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার করে একজন ব্যক্তিও অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের কার্যক্রম চালাতে পারেন।

প্রেসলি বলেন, তাঁদের পর্যবেক্ষণে অনলাইনের অস্বাভাবিক বা অসত্য কার্যক্রমের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাঁর দাবি, ২০২১ সালে কাজ শুরুর সময় তাঁরা যে বিষয়গুলো পরীক্ষা করতেন, তার প্রায় চারটির একটিতে অসত্য বা কৃত্রিমভাবে পরিচালিত কার্যক্রমের লক্ষণ পাওয়া যেত। এখন সেই হার প্রায় ১০টির মধ্যে ৯টিতে পৌঁছেছে।

তবে এটি গুদিয়ার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ বলে জানিয়েছেন প্রেসলি; বৃহত্তর ইন্টারনেটের সব ধরনের কার্যক্রমের প্রতিনিধিত্বকারী কোনো স্বাধীন পরিসংখ্যান হিসেবে একে উপস্থাপন করা হয়নি।

প্রতিষ্ঠার তিন বছরের মধ্যে গুদিয়ার গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৪০টিতে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন প্রেসলি। তাঁদের মধ্যে রয়েছে ফরচুন ৫০ তালিকার একটি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, একই তালিকার একটি খুচরা বিক্রেতা, বিশ্বের বৃহৎ এআই গবেষণাগারগুলোর একটি, একটি বড় সংগীত ব্যান্ড, জনসংযোগ ও সংকট মোকাবিলাবিষয়ক সংস্থা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান।

গত সপ্তাহে গুডিয়া ঘোষণা করেছে, তারা নতুন বিনিয়োগ হিসেবে ৭০ লাখ মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে। মুদিতা ভেঞ্চার পার্টনার্স ও সিলিকন রোড ভেঞ্চারস যৌথভাবে এই বিনিয়োগের নেতৃত্ব দিয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির মোট সংগৃহীত তহবিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় কোটি ডলারে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অনলাইনে কোনো বয়ান বা প্রচারণার উৎপত্তিস্থল আরও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করার প্রযুক্তি তৈরি করছে গুদিয়া। আগামী বছর চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা এ ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট আলোচনা কোথায় হচ্ছে, তা শহরের নির্দিষ্ট সড়ক বা ব্লক পর্যায় পর্যন্ত চিহ্নিত করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন প্রেসলি।

এ ছাড়া কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার শুরুর আগেই গুদিয়ার এআই মডেলের মাধ্যমে সেটি বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুবিধা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচারণা প্রকাশের আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারবে বলে আশা করছে গুদিয়া।

অনলাইনে গুজব, অপতথ্য ও সমন্বিত প্রচারণা শনাক্ত করার প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ার প্রেক্ষাপটে গুডিয়া নিজেদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে চায়। তবে এ ধরনের প্রযুক্তির কার্যকারিতার পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ভুলভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে থাকবে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন