- ১০ জানুয়ারি, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
প্রায় তিন দশক ধরে ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী—ন্যাশনাল বলিভারিয়ান আর্মড ফোর্সেস (এফএএনবি)—দেশটির রাজনীতিতে ছিল ক্ষমতাসীন শাসকদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভরসা। প্রয়াত হুগো চাভেজ থেকে শুরু করে নিকোলাস মাদুরো—দুজনের শাসনামলেই পশ্চিমা উদার গণতন্ত্র থেকে সরে গিয়ে কর্তৃত্ববাদী পথে হাঁটার সময় সেনাবাহিনী সক্রিয়ভাবে পাশে দাঁড়ায়। এর বিনিময়ে সামরিক বাহিনী পায় অভূতপূর্ব ক্ষমতা ও সুযোগ—মন্ত্রীত্ব, প্রাদেশিক গভর্নর পদ, কূটনৈতিক দায়িত্ব, এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণও।
কিন্তু গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর অভিযানে মাদুরো অপসৃত ও আটক হওয়ার পর সেই শক্ত অবস্থান বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটি ফুয়ের্তে তিউনা থেকে মাদুরোকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে দেয়। এতে সেনাবাহিনীর প্রযুক্তি, নজরদারি ও নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ও অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রোদ্রিগেজের সঙ্গে সমঝোতায় গিয়ে রাজনৈতিক রূপান্তরের অংশ হওয়া, অন্যদিকে সেই পথে না গেলে আরও মার্কিন সামরিক চাপ ও ক্ষমতা ক্ষয়ের ঝুঁকি।
বছরের পর বছর ধরে এফএএনবির প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতেও তারা প্রাধান্য বিস্তার করে। ২০২৪ সালের ২৮ জুলাইয়ের বিতর্কিত নির্বাচনের পর, ভোট জালিয়াতির অভিযোগে মাদুরো সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে দেশ কার্যত একটি কড়া নজরদারিভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বিরোধীদের ওপর নজরদারি ও দমন-পীড়নে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা আরও বাড়ে।
সে সময় সরকার সেনাবাহিনীর সঙ্গে শাসক দলের কর্মী, আধাসামরিক গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক পুলিশকে এক ছাতার নিচে এনে “নাগরিক-সামরিক-পুলিশ ঐক্য” নামে একটি কাঠামো গড়ে তোলে। এই ব্যবস্থার ওপর ভর করেই মাদুরো সরকার টিকে ছিল।
মাদুরো অপসারণের পরও ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের ধারণা, দেশটিতে যে কোনো সরকার—গণতান্ত্রিক বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে গঠিত—সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া কার্যকরভাবে দেশ চালাতে পারবে না।
এই বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রোদ্রিগেজের জন্যও সেনাবাহিনীর সমর্থন অপরিহার্য। সামরিক মহলে তার গ্রহণযোগ্যতাই যুক্তরাষ্ট্রকে তাকে রাজনৈতিক রূপান্তরের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে আশ্বস্ত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে মাদুরোকে আটক করার ঘটনা একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর দুর্বলতাও উন্মোচন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির তুলনায় এফএএনবির সক্ষমতার বিশাল ব্যবধান ভেনেজুয়েলাকে ভবিষ্যৎ আক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলছে—যদিও আপাতত ওয়াশিংটন নতুন অভিযানের ঘোষণা দেয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে চাইলে ভেনেজুয়েলার সামরিক নেতৃত্বকে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে মাদক পাচারের অভিযোগ থেকে নিজেদের দূরে রাখা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন তেল চুক্তি মেনে নেওয়া এবং অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নে ভূমিকা কমানো।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট রোদ্রিগেজের পাশে দাঁড়ানোই হতে পারে সেনাবাহিনীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র কার্যকর পথ। দেশটির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্যে স্থিতিশীলতা রক্ষার যুক্তি দেখিয়ে তারা এই অবস্থান নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতার মাধ্যমে সেনাবাহিনী মাদুরো-পরবর্তী সময়ে একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে চাইবে। তা না হলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক চাপ দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতাকে আরও গভীর করতে পারে—যার দায় শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী ও নতুন নেতৃত্বকেই বহন করতে হবে।