- ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
PNN আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত পাঁচ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা। নিহতদের মধ্যে প্রায় পাঁচশ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন। রোববার দেওয়া বক্তব্যে ওই কর্মকর্তা বলেন, যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী এই প্রাণহানির জন্য ‘সন্ত্রাসী ও সশস্ত্র দাঙ্গাকারীরা’ দায়ী, যারা নিরীহ ইরানিদের হত্যা করেছে বলে সরকারের অভিযোগ।
গত ২৮ ডিসেম্বর অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। দুই সপ্তাহের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক আন্দোলনে, যেখানে ধর্মীয় শাসনের অবসান চেয়ে স্লোগান ওঠে। এই অস্থিরতা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানে সবচেয়ে প্রাণঘাতী গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের হত্যা বা তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি তেহরানের নেতৃত্বকে ধন্যবাদ জানানোর কথা বলেন, কারণ তার ভাষ্য অনুযায়ী প্রায় ৮০০ জনের নির্ধারিত মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করা হয়েছিল। এর পরদিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এক ভাষণে ট্রাম্পকে ‘অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনেই ইরানে এই প্রাণহানি ঘটেছে।
খামেনি তার বক্তব্যে স্বীকার করেন যে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, তবে এই মৃত্যুর জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ‘সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাকারীদের’ দায়ী করেন। তিনি বলেন, দেশকে যুদ্ধে না ঠেলে দিলেও অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অপরাধীদের শাস্তি এড়াতে দেওয়া হবে না।
ইরানের বিচার বিভাগ ইঙ্গিত দিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়া আবারও শুরু হতে পারে। বিচার বিভাগের মুখপাত্র জানান, কিছু কর্মকাণ্ডকে ‘মোহরেব’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ইসলামী আইনে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত এবং এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অবশ্য সরকারি হিসাবের সঙ্গে মিলছে না। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তাদের হিসাবে এখন পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং আরও কয়েক হাজার ঘটনার তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে চব্বিশ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। তবে ইরানি কর্মকর্তা বলেন, যাচাইকৃত মৃত্যুর সংখ্যা হঠাৎ করে খুব বেশি বাড়ার সম্ভাবনা নেই এবং বিদেশি শক্তি ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোই বিক্ষোভকারীদের সহায়তা দিচ্ছে।
বিক্ষোভ দমনে সহিংস অভিযানের ফলে দেশটির অনেক এলাকায় পরিস্থিতি এখন তুলনামূলক শান্ত বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তেহরানের এক বাসিন্দা জানান, তিনি নিজ চোখে দেখেছেন দাঙ্গা পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযান দেখা গেছে, যার কিছু অংশ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম যাচাই করেছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষ ও প্রাণহানি ঘটেছে। সেখানে অতীতেও কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা ছিল এবং সাম্প্রতিক অস্থিরতায় পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে ওঠে। ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় ইরানের ভেতরের তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সংযোগ আংশিকভাবে চালু হলেও পরে আবার তা বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে, সহিংস দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে ইরানের বিক্ষোভ অনেকটাই স্তিমিত হলেও প্রাণহানি, গ্রেপ্তার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ঘিরে দেশটি এখনো গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যে রয়েছে।