Monday, January 12, 2026

গাজার নতুন বছরে বেঁচে থাকার লড়াই: ক্ষুধা, শোক আর অনিশ্চয়তার গল্প


ছবিঃ সানা ইসা (৪১) সাত সন্তানের জননী। যুদ্ধে তিনি তাঁর স্বামীকে হারিয়েছেন এবং বর্তমানে গাজার মধ্যাঞ্চলের দেইর এল-বালাহ এলাকায় একটি বাস্তুচ্যুত শিবিরে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছেন। (সংগৃহীত । আল জাজিরা)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

নতুন বছর এলেও গাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জীবনে কোনো উৎসব নেই, নেই স্বস্তির নিঃশ্বাস। প্লাস্টিকের ছাউনি দেওয়া একটি অস্থায়ী তাঁবুতে বসে নিজের সন্তানদের নিয়ে নিরব মুহূর্ত কাটানোর চেষ্টা করছেন ৪১ বছর বয়সী সানা ইসা। বাইরে টানা বৃষ্টি, ভেতরে ভেজা কম্বল আর অনাহারের ভয়—এই নিয়েই তাঁর প্রতিদিন।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঘোষণা এলেও সানার জীবনে তার কোনো বাস্তব প্রভাব পড়েনি। তিনি বলছেন, “আমরা বুঝতেই পারি না—এই দুর্দশার জন্য যুদ্ধ দায়ী, নাকি শীত, নাকি ক্ষুধা। এক সংকট কাটতে না কাটতেই আরেকটি এসে দাঁড়ায়।”

সানা সাত সন্তানের মা। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলি হামলায় স্বামী নিহত হওয়ার পর থেকে একাই সন্তানদের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। বুরেইজ এলাকা থেকে পালিয়ে এসে এখন আশ্রয় নিয়েছেন দেইর এল-বালাহতে। তাঁর ভাষায়, “খাবার জোগাড়, পানি পাওয়া, সিদ্ধান্ত নেওয়া—সবকিছুই আমাকে একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।”

২০২৫ সালে সানার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রতিদিনের এক টুকরো রুটি। দীর্ঘ অবরোধ ও দুর্ভিক্ষের মধ্যে এক কেজি আটা জোগাড় করাই হয়ে উঠেছিল অসম্ভব লড়াই। তিনি বলেন, “ঘুম ভাঙত একটাই ইচ্ছায়—আজ যেন সন্তানদের জন্য রুটি জোগাড় করতে পারি।”

এই ক্ষুধাই তাঁকে বাধ্য করে ঝুঁকিপূর্ণ ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে যেতে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত এসব কেন্দ্রে খাবার নিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন হাজারো ফিলিস্তিনি। সানাও রেহাই পাননি। একবার শেল-এর আঘাতে আহত হন তিনি, আর অন্য এক ঘটনায় তাঁর কিশোরী মেয়ে গুলিবিদ্ধ হয়।

তবুও থামেননি তিনি। কখনো কখনো পাঁচ কেজি আটা পেলে সেটাকেই দুই সপ্তাহ চালানোর চেষ্টা করেছেন। “সেদিন মনে হয়েছিল ঈদ এসেছে,” বলেই চোখ মুছলেন সানা।

তিনি প্রশ্ন রাখেন, “একটা রুটির জন্য এত অপমান, এত মৃত্যু—এটা কেমন মানবতা?”

তবুও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর একটুখানি আশা আছে—শীতের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, রান্নার জন্য গ্যাস, আর একদিন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ।

নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে ২০ বছর বয়সী বাতুল আবু শাওয়িশ দাঁড়িয়ে আছেন নিজের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির পাশে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে, যুদ্ধবিরতির সময়েই এক ইসরায়েলি হামলায় তিনি হারিয়েছেন বাবা-মা, দুই ভাই ও দুই বোন—পুরো পরিবার।

“এক মুহূর্তে সব অন্ধকার হয়ে গেল,” স্মৃতিচারণ করেন বাতুল। ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় এক ঘণ্টা আটকে থাকার পর উদ্ধার করা হলেও তিনি তখনো জানতেন না, তিনি একমাত্র জীবিত সদস্য হয়ে গেছেন।

হাসপাতালে শুয়ে বারবার মা-বাবার খোঁজ করেছিলেন তিনি। পরদিন স্বজনেরা জানায়—তাঁদের কেউ আর বেঁচে নেই। কয়েকদিন পর বাবাও মারা যান।

বাতুল বলেন, “যুদ্ধ দুই বছর টিকেছিল, আমরা সব সহ্য করেছি। ভেবেছিলাম বেঁচে গেছি। কিন্তু যুদ্ধবিরতির মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল।”

আজ তিনি একাই। নতুন বছরের কোনো চাওয়া নেই তাঁর। শুধু একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—“যদি যুদ্ধবিরতি থাকে, তাহলে আমার পরিবার কেন মারা গেল?”

সরকারি তথ্যমতে, গাজায় যুদ্ধে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে প্রায় আড়াই হাজার পরিবার। আরও প্রায় ছয় হাজার পরিবারে একজন মাত্র সদস্য জীবিত আছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও চাপা পড়ে আছে বহু মরদেহ।

এই বাস্তবতায় নতুন বছর গাজার মানুষের কাছে কোনো ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়—এটি টিকে থাকার আরেকটি কঠিন অধ্যায়ের শুরু মাত্র।

বাতুলের কথায়, “পরিবার ছাড়া জীবন মানে আজীবন অন্ধকারে থাকা। আর গাজায় এখন এমন মানুষের সংখ্যা অসংখ্য।”

তথ্যসুত্রঃ আল জাজিরা

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন