Monday, January 19, 2026

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ১০০ জনের মৃত্যু


ছবিঃ দর্শনার্থীরা লিমপোপো প্রদেশের বৃহত্তর এলাকায় ভারী বর্ষণের পর ১৬ জানুয়ারি ২০২৬-এ ফালাবোরও শহরের কাছে গা-সেলাটি নদীর উপর অবস্থিত সেতুর ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করছেন (সংগৃহীত । আল জাজিরা । পল বোতেস/এএফপি)

দক্ষিণ আফ্রিকায় কয়েক সপ্তাহ ধরে চলমান ভারী বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট বন্যা ও অবকাঠামো ধসে অন্তত একশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় এবং সড়ক–সেতু ভেঙে পড়ায় হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সামনে আরও বিধ্বংসী আবহাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই দুর্যোগ শুধু দক্ষিণ আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিবেশী মোজাম্বিক ও জিম্বাবুয়ে-তেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অতিরিক্ত পানির চাপ সহ্য করতে না পেরে নদী ও খাল উপচে পড়ায় বহু গ্রাম ও শহরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আঞ্চলিক আবহাওয়া দপ্তরগুলো নতুন করে সতর্কতা জারি করেছে, যা বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার লিমপোপো ও ম্পুমালাঙ্গা প্রদেশে বন্যায় অন্তত ৩০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ছাদ ও গাছে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করা হয়েছে। জিম্বাবুয়ে সীমান্তবর্তী একটি চেকপোস্ট বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় সেখানে দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মীদেরও সরিয়ে নিতে হয়েছে।

দেশটির প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বৃহস্পতিবার লিমপোপোর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, মাত্র এক সপ্তাহে কোনো কোনো এলাকায় প্রায় চারশ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, একটি জেলার এক অংশেই অন্তত ৩৬টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। লিমপোপোর প্রিমিয়ার ফোফি রামাথুবা জানিয়েছেন, পুরো প্রদেশে এক হাজারের বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জিম্বাবুয়ে থেকেও বড় ধরনের ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। চলতি বছরের শুরু থেকে সেখানে ৭০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ভেঙে পড়েছে অসংখ্য বাড়ি, বিদ্যালয়, সড়ক ও সেতু, যার ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মোজাম্বিক। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত বছরের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া বর্ষণে এখন পর্যন্ত ১০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর মধ্যে রয়েছে বন্যা, বজ্রপাত, ভবন ধস এবং দূষিত পানির কারণে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা। দেশজুড়ে দুই লক্ষের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হাজার হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং বহু মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় সত্তর হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা কৃষকদের খাদ্যসংকট আরও তীব্র হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দুর্ভিক্ষ আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা নেটওয়ার্ক (ফেমিন ইয়ারলি ওয়ার্নিং সিস্টেম) জানিয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকার অন্তত সাতটি দেশে ইতোমধ্যে বন্যা দেখা দিয়েছে অথবা বন্যার উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই অতিরিক্ত বর্ষণ সম্ভবত ‘লা নিনা’ নামে পরিচিত একটি বৈশ্বিক আবহাওয়া প্রবণতার প্রভাবে হচ্ছে, যা সাধারণত দক্ষিণ আফ্রিকা অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত বাড়িয়ে দেয়।

বন্যার প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র ক্রুগার জাতীয় উদ্যান-এও। সেখান থেকে প্রায় ৬০০ পর্যটক ও কর্মীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবে নদীর পানি উপচে পড়ায় উদ্যানের বহু এলাকা এখনো প্রবেশযোগ্য নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ আফ্রিকা অঞ্চলে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ—ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী খরা—প্রমাণ করছে যে এই অঞ্চল জলবায়ু-প্ররিত দুর্যোগের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। একই সঙ্গে দুর্বল অবকাঠামো পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন