- ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
বংশগত চোখের রোগ স্টারগার্ডট রোগে আক্রান্ত এক ব্যক্তির চোখে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তৈরি বিশেষ চিপ প্রতিস্থাপন করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সায়েন্স করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাক্স হোডাক জানিয়েছেন, চলমান পরীক্ষার অংশ হিসেবে গত মে মাসে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি আই হাসপাতালে ওই রোগীর চোখে বসানো হয় ‘প্রিমা’ (PRIMA) নামের ক্ষুদ্র যন্ত্রটি। পুনর্বাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীটি প্রথমে একটি অক্ষর এবং পরবর্তী সেশনে একটি শব্দ পড়তে সক্ষম হন।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রিমা এমন একটি ইমপ্লান্ট, যা চোখের আলো-সংবেদনশীল কোষের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও মস্তিষ্কে দৃশ্যসংকেত পৌঁছাতে সহায়তা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। স্টারগার্ডট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চোখের কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে কমে যায়। বর্তমানে এ রোগের নিরাময়মূলক চিকিৎসা নেই।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত টেকক্রাঞ্চ ডিসরাপ্ট সম্মেলনে ম্যাক্স হোডাক জানান, দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধারের প্রযুক্তিটি তাঁর প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (বিসিআই) গবেষণারই একটি অংশ। তাঁর মতে, মস্তিষ্কের সঙ্গে প্রযুক্তির সংযোগ স্থাপনের ধারণা শুধু কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা, শ্রবণসহায়তা এবং শরীরের নড়াচড়ার সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের মতো চিকিৎসাক্ষেত্রেও এর ব্যবহার সম্ভব।
স্টারগার্ডট রোগে চোখের রেটিনার বাইরের অংশের আলো-সংবেদনশীল কোষগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। এতে দৃষ্টিক্ষেত্রের মাঝখানে অন্ধকার বা ঝাপসা অংশ তৈরি হয়, যা সময়ের সঙ্গে বড় হতে পারে। তবে রেটিনার ভেতরের কিছু অংশ অক্ষত থাকতে পারে, যেগুলো চোখ থেকে মস্তিষ্কে দৃশ্যসংকেত পাঠানোর কাজে যুক্ত।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রিমা চিপটি ক্ষতিগ্রস্ত আলো-সংবেদনশীল কোষের জায়গায় কৃত্রিমভাবে দৃশ্যসংকেত তৈরির কাজ করে। এ পদ্ধতিতে রোগীর চোখের পেছনে একটি ক্ষুদ্র চিপ বসানো হয়। এরপর ক্যামেরাযুক্ত বিশেষ চশমার মাধ্যমে বাইরের দৃশ্য চিপে পাঠানো হয়। চিপটি সেই তথ্যকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে, যা চোখের অবশিষ্ট কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারে।
হোডাকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম রোগীর চোখে বসানো চিপটির আকার দুই মিলিমিটার বাই দুই মিলিমিটার। ফলে এখনই স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তির মতো বিস্তৃত দৃশ্য দেখা সম্ভব নয়। বরং রোগী সীমিত কেন্দ্রীয় দৃষ্টিক্ষেত্রে সাদা-কালো ও উচ্চ বৈপরীত্যের ছবি দেখতে পারেএন। এতে একবারে কয়েকটি অক্ষর শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরবর্তী লক্ষ্য হলো দৃষ্টিক্ষেত্র আরও বড় করা এবং দৃশ্যের সূক্ষ্মতা বাড়ানো। সে জন্য বড় আকারের ইমপ্লান্ট তৈরির পাশাপাশি ইলেকট্রোড আরও ছোট করার কাজ চলছে। হোডাক আশা প্রকাশ করেছেন, পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তি মানুষের ওপর পরীক্ষার পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হবে এবং আগামী পাঁচ বছরে স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তির কাছাকাছি যাওয়ার অগ্রগতি হতে পারে। তবে এটি তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা; ফলাফল নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা প্রয়োজন।
ম্যাক্স হোডাক আগে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান নিউরালিংকের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০২১ সালে নিউরালিংক ছাড়ার পর তিনি সায়েন্স করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি উন্নত স্নায়ুপ্রযুক্তি এবং ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস তৈরিতে কাজ করছে।
সায়েন্স করপোরেশনের পরিকল্পিত বিসিআই যন্ত্রটি নিউরালিংকের প্রচলিত নকশা থেকে আলাদা। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের সেন্সরটি মস্তিষ্কের টিস্যুর ভেতরে প্রবেশ না করে মাথার খুলির ভেতরে মস্তিষ্কের ওপর স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ এবং কিছু স্নায়বিক রোগের চিকিৎসায় সহায়তার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হোডাক জানিয়েছেন, স্ট্রোকের কারণে মস্তিষ্কের কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন অংশের মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরির প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে কি না, তা নিয়েও গবেষণা চলছে। তবে এসব সম্ভাবনা এখনো গবেষণা ও উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রথম বিসিআই প্রযুক্তি কোন নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করবে, তা এখনো প্রকাশ করেনি।
তাঁর মতে, ভবিষ্যতে মানুষের চিকিৎসায় বিসিআইয়ের ব্যবহার আরও বিস্তৃত হতে পারে। শুধু আয়ু বাড়ানো নয়, সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবন দীর্ঘায়িত করাও এ ধরনের প্রযুক্তি উন্নয়নের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো, প্রিমার মতো ইমপ্লান্ট কতটা নিরাপদ, দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর এবং সীমিত দৃষ্টিশক্তিকে দৈনন্দিন জীবনে কতটা কাজে লাগানো সম্ভব হবে। প্রথম রোগীর অভিজ্ঞতা আশাব্যঞ্জক হলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য প্রযুক্তিটি কার্যকর প্রমাণ করতে আরও ক্লিনিক্যাল তথ্য প্রয়োজন।