Monday, January 19, 2026

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বনাম অভ্যন্তরীণ সংকট: পাকিস্তানের ২০২৫ সালের দ্বিমুখী বাস্তবতা


ছবিঃ ওয়াশিংটন ডিসিতে হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শেহবাজ শরিফ (বামে) ও ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির (ডানে), সেপ্টেম্বর মাসে। (সংগৃহীত । আল জাজিরা)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

২০২৫ সালটি পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিকভাবে ছিল উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের বছর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য প্রশংসা, ভারত–পাকিস্তানের স্বল্পস্থায়ী সামরিক সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের অবস্থান নতুন করে আলোচনায় আসে।

ডিসেম্বরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় মার-এ-লাগোতে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর নেতৃত্বে একাধিক যুদ্ধ থামানো সম্ভব হয়েছে। বক্তব্যে তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘাত, এমনকি পারমাণবিক যুদ্ধ এড়ানোর কৃতিত্বও নিজের ঘাড়ে নেন। এ সময় তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তাঁর উদ্যোগে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে।

২০২৫ সালের জুন থেকে অন্তত ১০ বার প্রকাশ্যে আসিম মুনিরের প্রশংসা করেন ট্রাম্প। কখনো তাঁকে ‘দারুণ যোদ্ধা’, কখনো ‘অসাধারণ মানুষ’, আবার কখনো ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। অক্টোবরে মিসরের শারম এল শেখে গাজা যুদ্ধবিরতি উপলক্ষে আয়োজিত শান্তি সম্মেলনেও পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘনিষ্ঠতা পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সক্রিয়তার প্রতীক। কয়েক বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্র–পাকিস্তান সম্পর্ক ছিল বেশ নাজুক অবস্থায়। কিন্তু ২০২৫ সালে সেই সম্পর্ক নিরাপত্তা সহযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে অর্থনীতি, খনিজ সম্পদ ও নতুন প্রযুক্তিগত আলোচনায় প্রসারিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ মনে করেন, মে মাসে ভারত–পাকিস্তানের চার দিনের সামরিক সংঘাতই ছিল এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। কাশ্মীরে এক প্রাণঘাতী হামলার জেরে দুই দেশের মধ্যে শুরু হওয়া উত্তেজনা দ্রুত বিমান হামলা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

যদিও ভারত দাবি করে, দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই যুদ্ধ থেমেছে, পাকিস্তান প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার কথা স্বীকার করে এবং ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নও দেয়। ট্রাম্প নিজেও বারবার এই যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব নিজের বলে উল্লেখ করেন।

পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুররম দস্তগীর খানের ভাষায়, “এই সংঘাতই আন্তর্জাতিক পরিসরে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের প্রোফাইল বদলে দিয়েছে।”

যুদ্ধের পরপরই আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয়—পাকিস্তানের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বার। একই সঙ্গে সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তাঁকে চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস হিসেবে তিন বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব দেওয়া হয়। এই পদক্ষেপ দেশটির অভ্যন্তরে বিতর্ক তৈরি করলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়।

২০২৫ সালে পাকিস্তান বাংলাদেশ, মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে সক্রিয় হয়। দীর্ঘদিন পর ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের সফর, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ইরানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে ইসলামাবাদ।

তবে এই কূটনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি দেশের ভেতরে সমালোচনাও কম নয়। মানবাধিকার সংস্থা ও বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ—রাজনৈতিক দমন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তাজনিত সহিংসতা বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে সীমান্তবর্তী পশ্চিমাঞ্চলে সহিংসতায় প্রাণহানির হার এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছায়।

বিশ্লেষক মারিয়া রশিদের মতে, “আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্যের আড়ালে অভ্যন্তরীণ সংকটগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে।”

সমর্থকদের মতে, ২০২৫ সালে পাকিস্তান আবারও বৈশ্বিক রাজনীতিতে গুরুত্ব ফিরে পেয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, অতীতের মতোই এই উত্থান গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে, ২০২৫ সাল পাকিস্তানের জন্য ছিল একদিকে কূটনৈতিক পুনরুত্থানের বছর, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জেরও সময়—যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন