- ০৮ অক্টোবর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
রাজকীয় প্রাসাদ, চোখধাঁধানো পোশাক, মুখোশের আড়ালে গড়ে ওঠা প্রেম আর সমাজের শ্রেণিবিভাজন এই উপাদানগুলোই ‘ব্রিজারটন’কে অন্য ধারার রোমান্টিক সিরিজ থেকে আলাদা করেছে। ইতিহাসের আবহে কল্পনার গল্প সাজিয়ে নেটফ্লিক্সের এই সিরিজ শুরু থেকেই দর্শকদের আকৃষ্ট করে আসছে। চতুর্থ মৌসুমে এসে জনপ্রিয়তার সেই ধারায় যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। তবে বিপুল দর্শকপ্রিয়তার পাশাপাশি গল্পের পরিবর্তন ও কিছু দৃশ্যের উপস্থাপন নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
নেটফ্লিক্সের ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের দর্শকসংক্রান্ত হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সিরিজটির চতুর্থ মৌসুম দেখা হয়েছে ১০ কোটি বার। একই সময়ে আগের মৌসুমসহ ‘ব্রিজারটন’ ফ্র্যাঞ্চাইজির বিভিন্ন কনটেন্ট মিলিয়ে মোট ভিউ দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটিতে। চতুর্থ মৌসুম প্রকাশের পর আগের মৌসুমগুলোর দর্শকসংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধের তুলনায় প্রথম ছয় মাসে পুরোনো মৌসুমগুলোর সম্মিলিত দর্শকসংখ্যা প্রায় তিন গুণ হয়েছে বলে জানিয়েছে নেটফ্লিক্স।
কিন্তু কী এমন রয়েছে নতুন মৌসুমে, যা পুরোনো দর্শকদের আবার ফিরিয়ে এনেছে, আর নতুন দর্শকদেরও আকৃষ্ট করছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে প্রেম, সামাজিক বৈষম্য, চরিত্রের ব্যক্তিগত লড়াই এবং গল্প বলার পরিচিত ছকের ভেতরে নতুন কিছু তুলে ধরার চেষ্টা।
চতুর্থ মৌসুমের মূল গল্প আবর্তিত হয়েছে ব্রিজারটন পরিবারের দ্বিতীয় ছেলে বেনেডিক্টকে ঘিরে। পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো বিয়ে ও সংসার নিয়ে তার তেমন আগ্রহ নেই। স্বাধীনচেতা, শিল্পমনস্ক এবং কিছুটা খামখেয়ালি এই তরুণ নিজের শর্তে জীবন কাটাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
কিন্তু এক মুখোশধারী নারীর সঙ্গে পরিচয়ের পর তার জীবনে আসে পরিবর্তন। রুপালি পোশাকে সজ্জিত ওই নারীকে বেনেডিক্ট চেনে ‘লেডি ইন সিলভার’ নামে। রহস্যময় সেই সাক্ষাতের পর নারীটি হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজতে শুরু করে বেনেডিক্ট।
দর্শকের কাছে অবশ্য রহস্যটি খুব বেশিক্ষণ অজানা থাকে না। লেডি ইন সিলভার আসলে সোফি বেক, এক তরুণী, যার জীবন বেনেডিক্টের জগতের সম্পূর্ণ বিপরীত। একসময় সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হলেও সৎমায়ের নির্যাতন ও অবহেলায় সোফিকে গৃহকর্মীর জীবন বেছে নিতে হয়েছে। সামাজিক মর্যাদা হারিয়ে টিকে থাকার সংগ্রামই এখন তার নিত্যসঙ্গী।
বেনেডিক্টের চরিত্রে ফিরেছেন লুক থম্পসন। সোফির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অস্ট্রেলীয় অভিনেত্রী ইয়েরিন হা। জুলিয়া কুইনের ‘ব্রিজারটন’ উপন্যাসমালার তৃতীয় বই ‘অ্যান অফার ফ্রম আ জেন্টলম্যান’ অবলম্বনে তৈরি হয়েছে মৌসুমটির মূল প্রেমের গল্প।
গল্পের কাঠামোতে ধনী পরিবারের ছেলে ও নির্যাতিত তরুণীর প্রেমের যে পরিচিত ছক রয়েছে, তা অনেকের কাছে ‘সিন্ডারেলা’র গল্প মনে করিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সোফিকে কেবল ভাগ্য পরিবর্তনের অপেক্ষায় থাকা অসহায় চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেনি সিরিজটি।
নিজের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সোফির নিজস্ব সিদ্ধান্ত রয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও সে নিজের মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা করে। নির্মাতারা চরিত্রটির এই দিককে গুরুত্ব দিয়েছেন। সিরিজটির শোরানার জেস ব্রাউনেলও জানিয়েছেন, বইয়ের তুলনায় টেলিভিশন সংস্করণে সোফির নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মূল উপন্যাসের প্রেমের গল্প ধরে রাখলেও নেটফ্লিক্সের সংস্করণে চরিত্রের পটভূমি, সম্পর্কের ধরন ও পার্শ্বকাহিনিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফলে পরিচিত কাহিনির মধ্যেও নতুন কিছু দেখার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শকেরা।
‘ব্রিজারটন’ শুধু প্রেমের গল্প নয়; এর ভেতরে রয়েছে ক্ষমতা, অর্থ ও সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য। চতুর্থ মৌসুমে এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বেনেডিক্ট এমন একটি অভিজাত পরিবারের সন্তান, যেখানে পরিচয় ও সম্পদ তাকে সামাজিক সুবিধা দিয়েছে। অন্যদিকে সোফিকে প্রতিনিয়ত নিজের মর্যাদা ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করতে হয়। ফলে তাদের প্রেম ব্যক্তিগত আকর্ষণের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সমাজের প্রচলিত নিয়ম এবং শ্রেণিগত বাধা।
এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি হলো সোফিকে বেনেডিক্টের ‘মিস্ট্রেস’ বা বিবাহবহির্ভূত সঙ্গিনী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া। সোফির প্রতি আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও তাকে বিয়ের প্রস্তাব না দেওয়ার ঘটনায় অনেক দর্শক ক্ষুব্ধ হন। তাঁদের প্রশ্ন, গভীর প্রেমের দাবি করার পরও বেনেডিক্ট কীভাবে সোফিকে এমন একটি সম্পর্কে জড়ানোর প্রস্তাব দিতে পারে, যেখানে সামাজিক মর্যাদা ও স্বীকৃতির নিশ্চয়তা নেই?
গল্পের এই মোড় বেনেডিক্টের মানসিকতা এবং অভিজাত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে সোফির অতীত, আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তার সিদ্ধান্তের গুরুত্বও বাড়িয়ে দেয়।
সিরিজটির জনপ্রিয়তার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে সহজে দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারা প্রেমের গল্প, দৃষ্টিনন্দন নির্মাণ, সংগীত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা।
রাজকীয় প্রাসাদ, সুসজ্জিত বলরুম, বাগান, গয়না ও বাহারি পোশাক সিরিজটিকে দৃশ্যগতভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বিশেষ করে চতুর্থ মৌসুমের মুখোশ বল দর্শকদের মধ্যে আলাদা আগ্রহ তৈরি করে। নেটফ্লিক্সের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তির পর মৌসুমটি বিশ্বের ৯২টি দেশের টপ টেন তালিকায় জায়গা করে নেয় এবং বৈশ্বিক ইংরেজি টিভি তালিকায় শীর্ষে অভিষেক করে।
সংগীতও সিরিজটির অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য। সমসাময়িক জনপ্রিয় গানকে স্ট্রিং ও ধ্রুপদি সংগীতের আবহে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা গল্পের ঐতিহাসিক পরিবেশের সঙ্গে আধুনিক অনুভূতির সংযোগ তৈরি করে। চতুর্থ মৌসুম প্রকাশের পর সিরিজটির আনুষ্ঠানিক প্লেলিস্টের দৈনিক গড় স্ট্রিম বিশ্বজুড়ে ২৭১ শতাংশ বেড়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ‘ব্রিজারটন’ নিয়ে আগ্রহ কম নয়। চরিত্রের পোশাক, সংলাপ, প্রেমের দৃশ্য ও সংগীত নিয়ে দর্শকেরা নিয়মিত আলোচনা করেন। নেটফ্লিক্সের হিসাবে, চতুর্থ মৌসুম প্রকাশের প্রথম ৩১ দিনে সিরিজটির প্রচারণাসংক্রান্ত কনটেন্ট তাদের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৬৮০ কোটি ইমপ্রেশন তৈরি করে।
সিরিজটির জনপ্রিয়তা এখন আর পর্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নেটফ্লিক্সের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশে আয়োজন করা হয়েছে ‘ব্রিজারটন’ থিমের বল, মুখোশ উৎসব ও ভক্তদের মিলনমেলা। আর্জেন্টিনা, চিলি, ইতালি ও রোমানিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এসব আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব অনুষ্ঠানে অন্তত আটটি বাগ্দানের ঘটনাও ঘটেছে। ভেনিসের একটি বড় আয়োজনে অংশ নেন ২০ হাজারের বেশি মানুষ। সব মিলিয়ে বিশ্বের ২০টিরও বেশি শহরে অনুষ্ঠিত ভক্তদের আয়োজনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে।
এসব আয়োজন দেখিয়ে দিচ্ছে, ‘ব্রিজারটন’ এখন শুধু একটি টেলিভিশন সিরিজ নয়। এর পোশাক, সংগীত, বলরুম সংস্কৃতি ও রোমান্টিক আবহকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আলাদা এক বিনোদনধারা।
প্রথম মৌসুম থেকেই প্রেম ও যৌনতার উপস্থাপন ‘ব্রিজারটন’-এর আলোচিত বৈশিষ্ট্য। চতুর্থ মৌসুমেও বেনেডিক্ট ও সোফির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে একাধিক অন্তরঙ্গ দৃশ্য এসেছে। এর মধ্যে বাথটাবের দৃশ্যটি বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে।
তবে সিরিজটির নির্মাতারা দৃশ্যটিকে কেবল শারীরিক ঘনিষ্ঠতার মুহূর্ত হিসেবে দেখেননি। নেটফ্লিক্সের ব্যাখ্যায়, সোফির দীর্ঘদিনের কষ্ট ও অবহেলার বিপরীতে যত্ন এবং নিরাপত্তার অনুভূতি তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা ছিল এতে। বেনেডিক্টের কাছে সোফিকে যত্ন করার সুযোগটি তাই সম্পর্কের আবেগগত পরিবর্তনেরও অংশ।
জনপ্রিয়তার পাশাপাশি চতুর্থ মৌসুম নিয়ে দর্শকদের মধ্যে মতভেদও তৈরি হয়েছে। এর অন্যতম কারণ মূল উপন্যাস থেকে গল্পের বিভিন্ন পরিবর্তন। সোফির সঙ্গে বেনেডিক্টের সম্পর্ক, আরমিন্টার সঙ্গে সংঘাত এবং সোফির নিজের ভাগ্য নির্ধারণের বিষয়গুলোতে টেলিভিশন সংস্করণ বই থেকে ভিন্ন পথে এগিয়েছে।
বইয়ের ভক্তদের একাংশ এসব পরিবর্তনে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, মূল কাহিনির কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বদলে দেওয়ায় চরিত্র ও সম্পর্কের পরিচিত রূপ পাল্টে গেছে। অন্যদিকে নির্মাতাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, টেলিভিশনের উপযোগী করে চরিত্রগুলোকে আরও সক্রিয় ও সমসাময়িকভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন ছিল।
জাতিগত পরিচয় ও যৌনতার উপস্থাপন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সোফিকে কোরীয় বংশোদ্ভূত চরিত্র হিসেবে দেখানো এবং বেনেডিক্টের যৌন পরিচয় ও পূর্ববর্তী সম্পর্কগুলোর উপস্থাপন নিয়ে দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা গেছে। কিছু সমালোচকের মতে, এসব বিষয়কে গল্পে আরও গভীরভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল।
মুক্তির শুরুর দিকে অনলাইন দর্শক-রেটিং নিয়েও বিতর্ক হয়। কিছু পর্যবেক্ষক নেতিবাচক রিভিউয়ের পরিকল্পিত প্রবণতা, অর্থাৎ ‘রিভিউ বোম্বিং’-এর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, সমালোচকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার তুলনায় দর্শক-রেটিং কম থাকার পেছনে সিরিজের মানের বাইরের কিছু কারণও কাজ করে থাকতে পারে।
উল্লেখিত রেটিং অনুযায়ী, রটেন টমেটোজে চতুর্থ মৌসুমের সমালোচক স্কোর ৮৩ শতাংশ এবং দর্শক স্কোর ৭২ শতাংশ। সমালোচকদের মূল্যায়নে মৌসুমটিকে রূপকথার মতো রোমান্টিক, কিছুটা অনুমানযোগ্য হলেও আকর্ষণীয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ‘ব্রিজারটন ৪’-এর সাফল্য যেমন দর্শকের রোমান্টিক গল্পের প্রতি আগ্রহের প্রমাণ, তেমনি এটি দেখিয়েছে পরিচিত কাহিনি নতুনভাবে উপস্থাপন করতে গেলে প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাও আসতে পারে। প্রেমের টানাপোড়েন, সামাজিক বৈষম্য এবং চরিত্রের সিদ্ধান্ত ঘিরে তৈরি এই আলোচনা সিরিজটিকে শুধু বিনোদনের বিষয় নয়, দর্শকদের মতবিনিময়েরও একটি বড় ক্ষেত্র করে তুলেছে।