Wednesday, October 14, 2026

যুদ্ধবিরতির পরও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি দখল, ধ্বংসস্তূপে ফিরছে না হাজারো পরিবার


ছবিঃ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে লেবাননের হেনিয়ে থেকে আল-মানসুরিতে বিস্ফোরণের পর ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে (সংগৃহীত । আল জাজিরা /মোহাম্মদ আজাকির/রয়টার্স)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তবর্তী গ্রাম খিয়ামের বাসিন্দা আলী। নিজের বাড়ি ছেড়ে এখন তাঁকে থাকতে হচ্ছে প্রায় আধা ঘণ্টার পথ দূরের হাসবাইয়ায় ভাড়া নেওয়া একটি বাড়িতে। তাঁর মতো দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন গ্রামের হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের অনেকেরই জানা নেই, কবে নিজ বাড়িতে ফিরতে পারবেন, কিংবা আদৌ ফিরতে পারবেন কি না।

আলজাজিরাকে আলী বলেন, দক্ষিণ লেবাননের মানুষ এক ভয়াবহ দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর মতে, ব্যর্থ রাজনীতি ও ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। নিরাপত্তার কারণে নিজের পুরো নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি।

লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে গত জুনে একটি কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল ধাপে ধাপে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করা। কিন্তু চুক্তির পরও দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অঞ্চলটির কয়েক ডজন গ্রামে বাড়িঘর ও অবকাঠামো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এর আগে বলেছেন, লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। তাঁর এই অবস্থান থেকে দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘমেয়াদি দখলদারত্বের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর আগে ১৯৮২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২২ বছর দক্ষিণ লেবাননের কিছু অংশ দখলে রেখেছিল ইসরায়েল।

লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ গত ২ মার্চ ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করে। এক বছরেরও বেশি সময় পর এটিই ছিল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গোষ্ঠীটির প্রথম এমন হামলা। হিজবুল্লাহর দাবি, ২০২৪ সালের নভেম্বরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল বারবার লঙ্ঘন করছিল। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনারও প্রতিক্রিয়া ছিল এই হামলা।

এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননে নতুন করে সামরিক অভিযান জোরদার করে এবং দক্ষিণাঞ্চলে আবারও সেনা প্রবেশ করায়। এতে ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করে। হিজবুল্লাহ এই আলোচনার বিরোধিতা করলেও বৈরুত সরকার আলোচনা চালিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত একটি কাঠামোগত চুক্তি হয়।

চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল, নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে এবং সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনী দায়িত্ব নেবে। পরে ওই এলাকাগুলোতে হিজবুল্লাহর সশস্ত্র উপস্থিতি নিরস্ত্র করার কথা রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের ভেতরে প্রায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত একটি অঞ্চল ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত এই সীমারেখার পেছনে থাকা গ্রামগুলোতে বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গাজায় ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণাধীন একটি এলাকার ক্ষেত্রেও একই নাম ব্যবহার করা হয়।

দক্ষিণ লেবাননের বিনত জুবাইল এলাকার আদি বাসিন্দা এবং নিউইয়র্কভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ বাজ্জি মনে করেন, সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোকে জনশূন্য করে বসবাসের অনুপযোগী করে তোলাই ইসরায়েলের সামরিক কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য।

আলজাজিরাকে তিনি বলেন, স্যাটেলাইট চিত্রেও এসব এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখা গেছে। তাঁর মতে, গাজায় যে ধরনের ধ্বংস ও বাস্তুচ্যুতির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, দক্ষিণ লেবাননেও তার অনুরূপ চিত্র দেখা যাচ্ছে।

বাজ্জির ভাষ্য অনুযায়ী, খিয়াম ও বিনত জুবাইলসহ সীমান্তবর্তী প্রায় ৫০টি গ্রাম ও জনপদ ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে। আগের দখলদারত্বের সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির পার্থক্য হলো, এবার বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের বাড়িঘর ও অবকাঠামো এমনভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে, যাতে ফিরে আসা কঠিন, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, একাধিকবার যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও এসব জনপদের বড় অংশের ধ্বংসযজ্ঞ এপ্রিলের পরও অব্যাহত ছিল।

লেবাননের স্থপতি ও উন্মুক্ত তথ্য বিশ্লেষক আহমদ বাইদুনের মতে, ‘ইয়েলো লাইন’ এখন শুধু সেনা অবস্থানের সীমা নয়; গ্রামগুলোতে নিয়ন্ত্রিতভাবে স্থাপনা ধ্বংসের ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর একটি সীমানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, মনে হচ্ছে যুদ্ধবিরতি লেবাননের অন্যান্য অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য হলেও এই ভূখণ্ডের ক্ষেত্রে তার কার্যকারিতা নেই।

ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ইয়েলো লাইন’-এর উত্তরের কিছু এলাকায় বাসিন্দারা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গ্রামগুলোতে ফিরে যেতে শুরু করেছেন। এসব এলাকার কয়েকটি জনপদকে পরীক্ষামূলক প্রত্যাহার কর্মসূচির আওতায় রাখার কথাও রয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে ফ্রাউন শহর। ইসরায়েলি সেনারা সেখানে সরাসরি প্রবেশ না করলেও বিমান ও ড্রোন হামলায় শহরটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ফ্রাউনের পৌর কর্তৃপক্ষের প্রধান হাসান বাজ্জি জানান, তাঁদের শহরকে পরীক্ষামূলক এলাকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তে তাঁরা বিস্মিত হয়েছেন।

এদিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সামরিক নিয়ন্ত্রণের সীমা নির্ধারণে ‘ব্লু লাইন’ আগে থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পর জাতিসংঘ এই সীমারেখা নির্ধারণ করে।

এখন ইসরায়েলে ‘গ্রে লাইন’ নামে আরেকটি সীমারেখা তৈরির বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই রেখা লেবাননের ভূখণ্ডের প্রায় চার কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এর পেছনের এলাকাকে জনবসতিহীন বাফার জোন হিসেবে রাখার পরিকল্পনার কথা জানা গেছে। এমনটি হলে ওই এলাকার লেবাননি বাসিন্দারা নিজেদের বাড়িঘর পুনর্নির্মাণের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন।

মোহাম্মদ বাজ্জির মতে, বিভিন্ন রঙের সীমারেখা নিয়ে আলোচনা বাস্তব পরিস্থিতিকে অস্পষ্ট করে তুলতে পারে। তাঁর অভিযোগ, এসব ব্যবস্থার আড়ালে দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে দেওয়া এবং বসবাসের অনুপযোগী করে তোলার বাস্তবতা আড়াল হচ্ছে।

ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের কিছু গ্রামে এখনো বাসিন্দারা রয়েছেন। তবে তাঁদের বসবাসের সুযোগ থাকলেও স্বাভাবিক জীবনযাপনের স্বাধীনতা সীমিত বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।

আহমদ বাইদুনের মতে, ইয়েলো লাইনের ভেতরে বসবাসের অনুমতি পাওয়া কিছু গ্রাম প্রধানত খ্রিষ্টান ও সুন্নি মুসলিম অধ্যুষিত। অন্যদিকে দক্ষিণ লেবাননের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী শিয়া মুসলিম। কিছু এলাকার কর্মকর্তারা বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয় না দেওয়ার বিষয়ে সতর্কবার্তা পেয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাইদুন জানান, কাফারচৌবা গ্রামে পানি সরবরাহের কাজ করার সময় পৌরসভার কর্মীদের অপহরণ করা হয়েছিল এবং মেয়রকেও আটক করা হয়। আবার ইয়েলো লাইনের বাইরে দেইর মিমাস এলাকায় কৃষকদের জলপাই বাগানে যাতায়াতের সুবিধা দিতে লেবাননের সেনাবাহিনী একটি অবস্থান স্থাপন করলে ইসরায়েলি ট্যাংক গ্রামের প্রবেশপথে এসে বাধা দেয়।

তাঁর মতে, এসব ঘটনা দক্ষিণ লেবাননে এক ধরনের নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়। সেখানে মানুষকে জমিতে থাকতে দেওয়া হলেও নিজেদের জমি, কৃষিকাজ কিংবা দৈনন্দিন জীবন স্বাধীনভাবে পরিচালনা করার সুযোগ সীমিত।

কৃষিজমিতে প্রবেশের জন্য নিরাপত্তা চৌকি পার হওয়া, আগাম সমন্বয় করা এবং টহলরত সেনাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। পৌর কর্মকর্তাদেরও যেকোনো সময় আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাইদুন এই পরিস্থিতিকে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ওপর আরোপিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, কোনো জনপদ পুরোপুরি জনশূন্য না করেও সেখানে বসবাসরত মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব দক্ষিণ লেবাননে সেই বাস্তবতাই তৈরি হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ অদূর ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকতে পারে। লেবানন সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকায় অস্থায়ী বা পূর্বনির্মিত বাড়ি তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু পানি, বিদ্যুৎ ও পয়োনিষ্কাশনের মতো মৌলিক পরিষেবা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ, এসব এলাকার বিস্তীর্ণ অবকাঠামো ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

ইসরায়েলি সেনারা প্রত্যাহার করলেও সীমান্তবর্তী বহু জনপদে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় লাগবে। যেখানে একসময় বাড়িঘর ও কৃষিজমি ছিল, সেখানে এখন ধুলা, ইট-পাথরের ধ্বংসাবশেষ ও ছাই পড়ে রয়েছে।

হাসান বাজ্জির মতে, উল্লেখযোগ্য পুনর্নির্মাণকাজ করা গেলে কিছু শহরে মানুষ ফিরতে পারবেন। কিন্তু সীমান্তের কাছাকাছি প্রায় ৫০টি গ্রাম ও জনপদে স্বল্প বা মধ্যমেয়াদে মানুষের ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন না।

বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য সংকটটি কেবল বর্তমানের আশ্রয় বা জীবিকার নয়; তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। নিজেদের জমি ও বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বহু পরিবার অন্যত্র জীবন গড়তে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে তাঁদের ফেলে আসা এলাকা এখনো দখল ও সামরিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে।

খিয়ামের বাসিন্দা আলীর আশঙ্কা, তাঁদের শহর আগামী ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বসবাসের অনুপযোগী থাকতে পারে। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েলি হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ তাঁদের জীবনকে যেন আবার প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দিয়েছে।

দক্ষিণ লেবাননের মানুষের কাছে তাই যুদ্ধবিরতির অর্থ শুধু গোলাগুলি বন্ধ হওয়া নয়। নিজেদের ঘরে ফেরা, জমিতে চাষাবাদ করা এবং নিরাপদে জীবনযাপনের অধিকার ফিরে পাওয়াই তাঁদের প্রধান প্রত্যাশা। কিন্তু গ্রামগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এবং দখলদারত্ব অব্যাহত থাকার অভিযোগের মধ্যে সেই প্রত্যাশা এখনো অনিশ্চিত।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন