- ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে যখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে, তখন দেশটির দখলাধীন পশ্চিম তীরের লাখো ফিলিস্তিনির কাছে এই নির্বাচন খুব বেশি আশার আলো দেখাচ্ছে না। তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও ইসরায়েলের সরকার নির্বাচনে নিজেদের পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই তাঁদের। অন্যদিকে একই ভূখণ্ডে বসবাসরত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ভোট দেওয়ার অধিকার ভোগ করছেন।
পূর্ব জেরুজালেমের পূর্বদিকে অবস্থিত ছোট্ট বেদুইন জনপদ জাবাল আল-বাবার বাসিন্দাদের জীবন এই বৈষম্যের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। সেখানে বাড়িঘর নির্মাণ, পানি সংগ্রহ, রাস্তাঘাট তৈরি থেকে শুরু করে চলাচলের স্বাধীনতা জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফিলিস্তিনিদের নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হয়।
আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরে বসবাসরত প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির অধিকাংশই ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না। অথচ ওই ভূখণ্ডের বিভিন্ন এলাকায়, অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমসহ প্রায় ৩০০টি অবৈধ বসতি ও আউটপোস্টে বসবাস করছেন প্রায় সাত লাখ ইহুদি বসতি স্থাপনকারী।
জাবাল আল-বাবার সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি আতাল্লাহ আল-জাহালিনের ভাষায়, ফিলিস্তিনিদের এমনভাবে বিবেচনা করা হয়, যেন তাঁদের কোনো অস্তিত্বই নেই। তাঁর অভিযোগ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন নাগরিকের যে অধিকার পাওয়ার কথা, ফিলিস্তিনিরা তা থেকে বঞ্চিত।
জাবাল আল-বাবায় প্রায় ৪৫০ মানুষের বসবাস। এলাকাটি পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া সি’-এর অন্তর্ভুক্ত। ১৯৯০-এর দশকে অসলো চুক্তির আওতায় পশ্চিম তীরকে তিনটি প্রশাসনিক এলাকায় ভাগ করা হয়। এরিয়া সি পশ্চিম তীরের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত, যেখানে ইসরায়েলের সামরিক ও বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ কার্যত পূর্ণাঙ্গ।
জনপদটির অধিকাংশ বাসিন্দা জাহালিন গোত্রের সদস্য। তাঁদের অনেকেই ভেড়া ও ছাগল পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ঢেউটিনের তৈরি সাধারণ ঘরবাড়িতে বসবাস করা এসব মানুষের জীবন দীর্ঘদিন ধরেই উচ্ছেদ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে। তাঁদের পূর্বপুরুষদের অনেককে ১৯৪৮ সালের নাকবা বা ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির পর নেগেভ মরুভূমি অঞ্চল থেকে সরে যেতে হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল-জাহালিন জানান, সেখানে বাড়ি নির্মাণ, রাস্তা তৈরি কিংবা স্কুল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও নানা বাধা রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের চাপের পাশাপাশি নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানের কারণে বাসিন্দাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে তাঁদের এলাকায় শতাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। প্রতিবারই ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলার পর বাসিন্দাদের আবার সেগুলো নির্মাণ করতে হয়েছে।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া নির্মিত ফিলিস্তিনি স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলা হয়। তবে ইসরায়েলি অধিকার সংগঠন বিমকমের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এরিয়া সিতে ফিলিস্তিনিদের করা বাড়ি নির্মাণের অনুমতির আবেদনগুলোর ৯৯ শতাংশের বেশি প্রত্যাখ্যান করেছে কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ হিসেবে বিবেচিত ইসরায়েলি বসতিগুলোর সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণবিরোধী সংগঠন পিস নাউয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে দেশটির নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা এক সিদ্ধান্তে ৩৪টি নতুন বসতি অনুমোদন করেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে আগে গড়ে ওঠা কিছু বসতিকে পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।
আল-জাহালিনের আশঙ্কা, এসব পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য তাঁদের মতো ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে নিজেদের বসতভিটা থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং সেখানে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করা।
ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তার নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী জোটের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে গঠিত বিরোধী শিবির। এই শিবিরের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নাম আলোচনায় রয়েছে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দুই পক্ষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে কোনো পক্ষই নিশ্চিতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের অবস্থানে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। বিরোধী শিবিরের অধিকাংশ ইহুদি নেতা ইসরায়েলের আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনাও নাকচ করে দিয়েছেন। এসব দল দেশটির প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব করে।
তবে ফিলিস্তিনিদের অনেকের কাছে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলেও দখলদারত্ব ও বসতি সম্প্রসারণের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
‘স্টপ দ্য ওয়াল’ নামের তৃণমূলভিত্তিক আন্দোলনের সমন্বয়ক জামাল জুমা মনে করেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের ইতিহাস শুধু ডানপন্থী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। ১৯৬৭ সালের পর পশ্চিম তীরে বসতি নির্মাণ শুরু করেছিল ইসরায়েলের মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টির সরকারও। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের দখলদারত্ব ফিলিস্তিনিদের শিখিয়েছে যে, শুধু সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে মূল নীতির পরিবর্তন আশা করা কঠিন।
জাবাল আল-বাবার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে ‘ই১’ নামে পরিচিত একটি এলাকা। জেরুজালেম ও অবৈধ ইসরায়েলি বসতি মালে আদুমিমের মধ্যবর্তী এই ভূখণ্ডে বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে যোগাযোগ আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে জাবাল আল-বাবাসহ প্রায় ১৮টি বেদুইন জনগোষ্ঠীর জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের আগস্টে ইসরায়েল ই১ এলাকায় ৩ হাজার ৪০১টি বসতবাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। সে সময় দেশটির কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ বলেছিলেন, এই প্রকল্প ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাকে ‘কবর’ দেবে। পরের মাসে নেতানিয়াহুও ঘোষণা দেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে না এবং ওই ভূখণ্ড ইসরায়েলের।
চলতি বছর ইসরায়েল সরকার ই১ এলাকার জমি বিক্রির জন্য দুটি দরপত্র আহ্বান করে। নির্বাচনের আগে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল এর কিছু অংশ নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখার পদক্ষেপ নিয়েছেন। স্মোত্রিচ এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী আইজেনকট ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাকে ‘অবাস্তব’ বলে মন্তব্য করেছেন। পাশাপাশি তিনি পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি শক্তিশালী করার পক্ষেও অবস্থান জানিয়েছেন। তবে গত আগস্টে ই১ প্রকল্পের দরপত্র নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এখন নয়’। তাঁর মতে, এই সময়ে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া ভুল হবে এবং এর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ড ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তির ক্ষতি করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অর্থাৎ, প্রকল্পটির সময় নির্ধারণ নিয়ে বর্তমান সরকারের সঙ্গে আইজেনকটের মতপার্থক্য থাকলেও পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের মূল ধারণা নিয়ে তাঁর অবস্থান ভিন্ন নয়।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বি’তসেলেমের মাঠপর্যায়ের গবেষণা পরিচালক কারিম জুবরান মনে করেন, ইসরায়েলে গণতন্ত্রের সুযোগ মূলত ইহুদিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাঁর ভাষায়, সরকার পরিবর্তন হলেও বিদ্যমান ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো অটুট থাকে।
পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ শুধু এরিয়া সির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ‘স্টপ দ্য ওয়াল’ আন্দোলনের সমন্বয়ক জামাল জুমার অভিযোগ, ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামের মধ্যে চলাচল, পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ এবং ভূখণ্ডের সীমান্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তাঁর দাবি, অনেক ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামের প্রবেশপথে গেট তৈরি করা হয়েছে, যা মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে।
জুমার আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি জনপদগুলো একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তাঁর ভাষায়, একসময় এসব এলাকা গাজার মতো বিচ্ছিন্ন ও অবরুদ্ধ জনপদে পরিণত হতে পারে।
কারিম জুবরানের মতে, ই১ প্রকল্পসহ বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থামাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক চাপ জোরালো হলে এ ধরনের প্রকল্প বন্ধ বা স্থগিত করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। তবে কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে প্রকল্পটি এগিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাবাল আল-বাবার বাসিন্দাদের জন্য এসব রাজনৈতিক বিতর্কের অর্থ অত্যন্ত বাস্তব। বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা এগিয়ে গেলে তাঁদের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নতুন করে হুমকির মুখে পড়তে পারে।
আল-জাহালিনের পরিবার একবার নেগেভ অঞ্চল থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছিল। কিন্তু এবার আর নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে যেতে রাজি নন তিনি।
তাঁর বক্তব্য, বাবার মতো বাস্তুচ্যুতির জীবন তিনি আর বেছে নিতে চান না। একজন ফিলিস্তিনি হিসেবে বেঁচে থাকুন কিংবা মৃত্যুবরণ করুন—নিজের ভূমিতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
ইসরায়েলের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত যে পক্ষই জয়ী হোক, পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের কাছে তাই প্রশ্নটি শুধু কে সরকার গঠন করবে, তা নয়। বরং নতুন সরকার তাঁদের অধিকার, নিরাপত্তা ও নিজ ভূমিতে টিকে থাকার সম্ভাবনায় কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।